২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। পৃথিবীর ইতিহাসে এই তারিখকে তাৎপর্যময় করেছেন এদেশের তরুণ-ছাত্র-যুবকরা। আজ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে দিবসটি শ্রদ্ধার সাথে পালন করা হয়। যার যার মাতৃভাষাকে রক্ষার শপথে প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠী নতুন চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে শপথের বলে বলীয়ান হয়। ২০০০ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে এই ধারা শুরু হয়েছে। ঐ বছর পৃথিবীর ১৯৩টি দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী ২১ ফেব্রুয়ারির যে বিস্তৃতি ঘটেছে, সেই অর্জনের নেপথ্যে আছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস।
আমরা জানি, আমাদের ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশ শাসিত ভারতে ১৯১১ সালে। শেষ হয়েছে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আত্মদানের মধ্য দিয়ে। এজন্যই ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মর্যাদা পাওয়ার আগে থেকেই আমাদের জন্য শোকের দিন ‘শহীদ দিবস’। আমরা প্রতি বছরের এই দিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি ১৯৫২ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি আদায়ের দাবিতে জীবনদানকারী শহীদ রফিক, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম, শফিউর রহমান, ওয়ালিউল্লাহ এবং তাঁর সাথীদের। কিন্তু আজ শুধু আমরা একা নই, আমাদের এই অর্জন জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করেছে। জাতিসংঘের সদস্য প্রত্যেক দেশে দিবসটি যথাযথ মর্যাদার সাথে পালন করা হয়। আমাদের শহীদ দিবস আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সবল কিংবা দুর্বল কোনো জাতির ভাষাকেই অমর্যাদা করার অধিকার কারো নেই। যার যার মাতৃভাষা, তার জন্য বিশ্বজাহানের স্রষ্টা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে পাওয়া মহামূল্যবান উপহার। এই উপহারের মর্যাদা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। আল্লাহর ভাষায়, ‘আর তাঁর (আল্লাহর)  নিদর্শনাবলীর মধ্যে অন্যতম নিদর্শন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। (সূরা রূম : ২২)। মহান আল্লাহর এই নিদর্শন রক্ষার অনুপ্রেরণা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বিশ্ববিস্তৃত করার আয়োজন নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমরা আজও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে পারিনি। অথচ আমাদের সংবিধানের প্রথম ভাগের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বলা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ এর মানে সংবিধান যেদিন প্রণীত হলো, সেদিন থেকেই এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ১৯৮৭ সালে দেশে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন হয়েছে। আইন করার পরও সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন হয়নি। উচ্চ আদালতে বাংলা চালু হয়নি। সেখানে আইনি পরিভাষার দোহাই দেওয়া হয়। আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও জটিলতা দূর হয়নি। সেখানেও আমরা বাংলার প্রচলন করতে পারিনি।
আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের একটা ভাষানীতি এবং ভাষা পরিকল্পনা থাকা দরকার। একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। গোটা বিশ্ব আজ একটি গ্রামের মতো। সবার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে আমাদের অন্যান্য বিশ্ব ভাষাও শিখতে হবে। কিন্তু সেটা আমাদের বাংলা ভাষা বাদ দিয়ে তো নয়। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় সমস্যা আছে, তা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশুদ্ধ প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি ভাষার সমৃদ্ধ সাহিত্যের অনুবাদের সাথে সাথে আমাদের মাতৃভাষার সমৃদ্ধির জন্য বাংলা ভাষায় মৌলিক সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চা বাড়াতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>