–আনিস রায়হান–

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এগিয়ে আসছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পুরো দেশ এখন ভোটযুদ্ধের দিকে ধাবমান। এই নির্বাচনী যুদ্ধে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন দুই জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে।
ভোটযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর জোট এবার জোর আলোচনায়। জোটভিত্তিক নির্বাচন দেশে আগেও হয়েছে। তবে এবারের নির্বাচন যেমন সম্পূর্ণ নতুন এক প্রেক্ষাপট, এই নির্বাচন ঘিরে জোটের রাজনীতিও তেমনি আকর্ষণীয় চেহারা ধারণ করেছে। কিন্তু জোটের রাজনীতি কি বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক জট ছাড়াতে পারবে নাকি তা আরও বাড়িয়ে দেবে, এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
জোটের আকার, রূপ, কর্মকা-ই এসব প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। যদিও এসব জোট গঠন হয়েছে রাজনীতির ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বলেই। নেতারা ঘোষণা দিচ্ছেন দিনবদলের, স্বপ্ন দেখাচ্ছেন গণতন্ত্র সত্যিকারার্থে কায়েম করার। এসব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে তারা একে অপরের নিকটবর্তী হচ্ছেন। জিয়ার সহচর উঠেছেন নৌকায়, আর শেখ মুজিবের সহচর হাতে তুলে নিয়েছেন ধানের শীষ।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টে আছেন চরম ডানপন্থি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, আবার বামঘেঁষা নরমপন্থি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীও আছেন বহাল তবিয়তে। আওয়ামী লীগের জোটে আছে বেশ কয়েকটি বামপন্থি দল, আবার ধর্মভিত্তিক দলগুলোকেও জোটভুক্ত করতে পেরেছে তারা। সেই অর্থে উভয় জোটই ডান-বামের মিশেলে তৈরি!
বিএনপির জোটে এমন ব্যক্তিরা জড়ো হয়েছেন, যাদের কেউ কেউ যে কোনো উপায়ে নির্বাচনে জয়ে আগ্রহী। আবার কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তিরাও আছেন, যারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দাবি করেন, তাতে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলেও তাদের আপত্তি নেই। আওয়ামী লীগ জোটেও এমন ব্যক্তিরা আছেন, যারা সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার করে যে কোনো প্রকারে ক্ষমতায় যাওয়ার পক্ষপাতি, আবার মাশরাফির মতো কেউ কেউ চান সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করবে।
জোট রাজনীতির একটি লক্ষ্য আপাত, অন্যটি চূড়ান্ত। আপাত লক্ষ্য অর্জনে দুই বড় দলই ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। বিএনপির আপাত লক্ষ্যটি ছিল এমন এক জোট গড়া যার মাধ্যমে দেশবাসী ও বিদেশিদের কাছে সরকারকে মিত্রহীন প্রমাণ করা যায়। আর আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ছিল বিএনপির জোটকে বিভক্ত করে পুরো দলটাকেই ভাঙনের মুখে ঠেলে দেয়া এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের দুর্বল করে ফেলা। দুই দলই জোট গঠনের এই আপাত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে জোট গঠনের চূড়ান্ত লক্ষ্যটা হচ্ছে নির্বাচন। সেক্ষেত্রে উভয় দলই সফল। আওয়ামী লীগ এবারও জাতীয় পার্টি ও বামপন্থিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে সঙ্গে ধরে রাখতে পেরেছে। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বড় অংশটিও তার দিকে। পাশাপাশি বড় অর্জন হলো ডা. বদরুদ্দোজার নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টকে সঙ্গে পাওয়া। বিএনপি থেকে বেরিয়ে আসা গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সরাসরি আওয়ামী লীগে না নিয়ে, যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে নির্বাচনে তাদের সঙ্গী করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এর মাধ্যমে। তেমনি বিএনপি তো রাস্তায়ই নামতে পারছিল না। তারা দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী কিছু নেতাকে ঢাল বানাতে সক্ষম হয়েছে। নির্বাচনী জোটে তারা পেয়েছে ড. কামাল হোসেন, মান্না, রবদের। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে বিএনপির ইমেজের যে ক্ষতি হয়েছে তা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে দলটি। আবার অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে জামায়াতকেও তারা ধরে রাখতে পেরেছে।
দেখা যাচ্ছে, দলীয় স্বার্থ রক্ষায় বড় দুই দল জোটের রাজনীতি করে এখন পর্যন্ত সফল।

২.

জোটের মেরুকরণে এবার বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছে ২০ দলীয় জোট, সেখানে সম্প্রতি আরও তিনটি দল যুক্ত হয়েছে। এছাড়া বিএনপি আছে ঐক্যফ্রণ্টে, সেখানে তাদের সঙ্গে আছে আরও ৫টি দল। এদিকে ১৪ দলের বাইরে এবার আওয়ামী লীগের প্রধান নির্বাচনী সঙ্গী জাতীয় পার্টি। তাদের সঙ্গে রয়েছে প্রায় ৫৮টি রাজনৈতিক দল। নাজমুল হুদার সঙ্গে রয়েছে বিএনএ (বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট অ্যালায়েন্স) নামে ২০টির মতো দল। সাবেক রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টে ১২টি দল রয়েছে। এর বাইরেও জাকের পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামিক ফ্রন্ট, সম্মিলিত ইসলামী জোট, ইসলামী ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স ও আরও কয়েকটি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করতে চাইছে। সবমিলিয়ে আওয়ামী লীগের এবার নির্বাচনী সঙ্গী ৯০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল।
এটা পরিষ্কার যে, বড় দলগুলো জোট করে ক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, আর ছোট দলগুলো জোট করে নিজেদের অবস্থার উন্নতির জন্য। এতে বোঝা যায়, এককভাবে নির্বাচন করে সরকার গঠন করার বিষয়ে বড় দলগুলোর ভীতি আছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সব দল আলাদা নির্বাচন করে, সর্বোচ্চ আসন পায় বিএনপি। কিন্তু প্রয়োজনীয়সংখ্যক আসন না পাওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ছাড়া বিএনপির পক্ষে সরকার গঠন সম্ভব ছিল না। একই অবস্থা তৈরি হয়েছিল ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে। নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও জাতীয় পার্টির সহায়তা ছাড়া সরকার গঠন করতে পারেনি তারা। জোটের রাজনীতির ভিত্তি সূচিত হয় এর মধ্য দিয়েই।
২০০১ সালে আগের দুই ভোটের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে বিএনপি এবং তারা ব্যাপকভাবে বিজয়ী হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগই একই সমীকরণ অনুসরণ করে এবং সাফল্য পায়। এবারের নির্বাচনে তাই জোট বাঁধাটা বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারি দলের ক্ষেত্রে সেটা ততটা না হলেও বিরোধীদের জন্য জোট গঠনের ব্যাপারটি এমনকি আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবেও পরিগণিত হচ্ছে। অর্থাৎ জোট কেবল ভোট বাড়াতে নয়, অস্তিত্ব রক্ষায় এবং রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে দলগুলোর এবারের জোটবদ্ধতা নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠছে আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে। আওয়ামী ধারার রাজনীতিকরা বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করছেন, বিএনপির আদর্শে বিশ্বাসী নেতারা আওয়ামী লীগের তরীতে ভিড়েছেন, এটা অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। বলা হচ্ছে, লোভ আর ক্ষোভই এহেন জোট গঠনের মূল কারণ। কেউ কেউ দলের ওপর ক্ষুব্ধ, সেই ক্ষোভ এবং ক্ষমতার লোভ থেকে নেতারা এত দিনের চর্চা ত্যাগ করছেন।
কিন্তু বাংলাদেশে প্রচলিত ধারার রাজনীতিতে এ ধরনের ঐক্য নতুন কিছু নয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম, গণতন্ত্রী দল আর কংগ্রেস মিলে নৌকা মার্কায় নির্বাচন করে। ১৯৬৪ সালের জুলাই মাসে মুসলিম লীগের নেতা খাজা নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), কাউন্সিল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং নেজামে ইসলাম একজোট হয়ে তৈরি করেছিল কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি (কপ)।
এবার প্রথিতযশা আওয়ামী ধারার নেতারা অনেকে ধানের শীষ মার্কায় ভোটে দাঁড়াতে পারেন। তেমনি জাতীয়তাবাদী ধারার কেউ কেউ চড়বেন নৌকায়। এটা নিয়েও বিস্তর আলাপ হচ্ছে। কিন্তু মার্কার হাতবদলও নতুন কিছু নয়। এখন বিএনপির মার্কা যে ধানের শীষ তা এক সময় ছিল মওলানা ভাসানীর ন্যাপের মার্কা। আতাউর রহমান খানের জাতীয় লীগের লাঙ্গল এখন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দখলে।
কার্যত বড় দলগুলো জোট গড়ে ভোটে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে, এর বাইরে এসব জোটের বিশেষ কিছু করার নেই। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটভুক্ত দলগুলো বিভিন্ন সময় এমন অভিযোগ করেছে যে, দল ক্ষমতায় আসার পর এমনকি জোটের একটি বৈঠকও হয় না। শরিক দলের নেতাদের মনোভাবকে কোনো গুরুত্বই দেন না ক্ষমতায় থাকা জোটের প্রধান দলের নেতারা। কিন্তু তা সত্ত্বেও জোটের অস্তিত্ব তারা টিকিয়ে রাখছেন। এই অপমান কিংবা বৈষম্যের জবাব দেয়ার কোনো প্রয়োজন মহাজোটভুক্ত নেতারা অনুভব করেননি।
ছোট দলগুলো দাবি করে থাকে, জোটে গেলে তাদের শক্তি বৃদ্ধি হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বর্তমান মহাজোটে থাকা দলগুলোর আসন অংশীদারত্ব আগের তুলনায় এবার কমতে পারে। অর্থাৎ ওয়ার্কার্স পার্টির ছয়টি আসন ছিল, এবার তা কমতে পারে। অথচ ক্ষমতায় থাকার কারণে তারা নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। সেই হিসেবে এতদিনে তাদের সাংগঠনিক শক্তি আরও বিস্তৃত হওয়ার কথা। ওয়ার্কার্স পার্টি আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৩২ জন প্রার্থী দিতে চেয়েছে জোটবদ্ধভাবে, এর মধ্যে ১০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপারে তারা দৃঢ়। কিন্তু জোটের বড় দল আওয়ামী লীগ এবার ওয়ার্কার্স পার্টিকে আগের চেয়ে কম আসন দিতে চায়। জাতীয় পার্টির ব্যাপারেও আওয়ামী লীগের মনোভাব একই। সেক্ষেত্রে জোট করে তারা কতখানি এগিয়েছেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়!
তাছাড়া জোট গঠনের সময় রাজনৈতিক আদর্শের ঘনিষ্ঠতা, ইস্যুগত ঐক্যসহ নানা প্রশ্নে একমত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে। নতুন একটি জোট গঠনের প্রাক্কালে আগের জোটটি কেন কাজ করছে না, কেন নতুন জোট গড়া হচ্ছে সেসব ব্যাখ্যা দিতে হয়। দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের জোটে একদিকে বামপন্থিদের জোটে নেয়া হচ্ছে, আবার ধর্মীয় দলকেও টানা হচ্ছে। অথচ তাদের সামনে এমন কোনো ইস্যুগত ব্যাপার নেই যে, এ ধরনের বিপরীতমুখী দল এক ঘাটে পানি খাবে। কেবল সরকার গঠনের লক্ষ্যেই এই জোট। দলগুলো সরকারে যাওয়ার লক্ষ্যে বড় দলের এই আপস-রফা নিয়ে কথা বলছে না। পাশাপাশি আগের জোট বাতিল না করে কীভাবে বিপরীত আদর্শের নতুন নতুন দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগ জোট বাঁধছে, এই প্রশ্নটাও তারা জোর দিয়ে করতে পারছেন না।
জোটভিত্তিক রাজনীতির এসব চিত্র থেকে এটা পরিষ্কার যে, নির্বাচনী আপস-রফার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক জোট রাজনীতিকে আরও কলুষিত করা ছাড়া নতুন কিছু দেয়নি। এটা বড় দলগুলোর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাকে সুসংহত করেছে। জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের মতো মাঝারি সারির দলগুলোকে উচ্ছিষ্টভোজীতে রূপান্তরিত করেছে। ছোট দলগুলোর উত্থানের সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে, তাদের বড় দলের সমর্থকে পরিণত করেছে। জোটভুক্ত এসব ছোট দলের নেতারা বড় দলের সঙ্গে মিলে সরকারে গিয়ে নিজেদের ত্যাগী চরিত্র হারিয়েছেন, অনেকের নামে তো দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে।
সরকারের বর্তমান মিত্র জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু এক সময় আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতি করলেও এখন আওয়ামী লীগারদের চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার হিসেবে তার নাম উঠে আসছে। জোটের রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি দলের আদর্শ বিকিয়ে দিচ্ছেন মর্মে অভিযোগ আছে। সাম্যবাদী দলের নেতা দিলীপ বড়ুয়াকে ২০০৯ সালের সরকারে টেকনোক্র্যাট হিসেবে শিল্প মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে পরবর্তীতে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

৩.
এবারের নির্বাচনে অবশ্য জোট গঠনের যে ধারা, তাতে অনেকেই আশায় বুক বাঁধছেন। বিএনপি যদিও বড় দল, তবু তারা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট নেতারা রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনার কথা বলছেন। বিএনপির জনসভায় দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রশস্তি গাইছেন, আবার জোর গলায় দাবি করছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি। এটা কাউকে কাউকে আশা জোগাচ্ছে যে, এবার হয়তো রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসতে চলেছে।
কিন্তু পাল্টা মত হলো, বিএনপি এই মুহূর্তে বিপদে আছে। সরকার তাদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। তাই তারা ঢাল হিসেবে এমন একটি জোট গঠনে উৎসাহী হয়েছে। নির্বাচনে জিতলে সংসদে তাদেরই দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে। খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন, এটাও নির্দ্বিধায় বলা যায় তারেক রহমান ফিরে আসবেন। এভাবে অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে যাবে, বিএনপি তখন রাজত্ব করবে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি যে ধরনের রাজনীতি করে এসেছে, সেই রাজনীতিই তখন শক্তি পাবে। এমনকি জামায়াতের পুনরুজ্জীবনও ঘটতে পারে তাদের হাত ধরে। গুম, খুনের প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি আরও শক্ত ভিত্তি পেতে পারে, যেমনটা পেয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে।
আর ঐক্যফ্রন্ট যদি ভোটে না জেতে সেক্ষেত্রে ধারণা করা যায়, এই জোট সরকার বিরোধিতার সূত্রে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে জোটভিত্তিক রাজনীতি যে দেশের রাজনীতির জট ছাড়াতে পারবে না, এটা বলতে গণক হওয়ার প্রয়োজন নেই। দুই বড় দলের জোট বাঁধার প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনী প্রস্তুতিতে এটা স্পষ্ট।
রাজনীতিতে এতদিন ধরে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে বিএনপির সবাই খারাপ। তারা দুর্নীতিবাজ, চক্রান্তকারী, খুনি, আগুন সন্ত্রাসী, মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা যখন তাদের দিকে ঝুঁকছেন, তখন আর তাদের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উঠছে না। চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও বিএনপির সাবেক নেতা মনজুর আলম সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন কিনেছেন।
বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা শমসের মবিন চৌধুরী এক সময়ে তারেক রহমানের মদদে বিএনপির প্রাণ হয়ে ওঠেন। এখন তিনি যুক্ত হয়েছেন আওয়ামী লীগের ছায়ায় থাকা যুক্তফ্রন্টে। যেখানে স্বয়ং আছেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। বিএনপি যাকে সাংসদ, মন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি সবই বানিয়েছিল। ছাত্রদলের প্রথম নির্বাচিত সভাপতি গোলাম সারোয়ার এখন বিকল্পধারায়। জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী নাজিম উদ্দিন আল আজাদও বিকল্পধারায় যোগ দিয়ে যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচনে লড়বেন।
মৌলভীবাজার-২ আসনে এর আগে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। আর ধানের শীষে একবার এবং স্বতন্ত্র একবার নির্বাচন করেছেন এমএম শাহীন। কিন্তু এবারের ভোটে আগের সবকিছু পাল্টে গেছে। নৌকার সুলতান গেছে ঐক্যফ্রন্টের ধানের শীষে। আর ধানের শীষের শাহীন চলে এসেছেন বিকল্পধারার কুলায়।
এক সময় আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, মাহমুদুর রহমান মান্না ও কামাল হোসেন। তারা প্রত্যেকেই এখন ধানের শীষ নির্বাচন করার অপেক্ষায়। অথচ কামাল হোসেন এক সময় ছিলেন আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া যোগ দিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দল গণফোরামে। যদিও বিএনপি বরাবরই আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বিরূপ। কিন্তু আওয়ামী ধারার এসব নেতাকে জোটে বা দলে নিতে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
জোট করার ক্ষেত্রে দুই দলের এমন প্রবণতা কোনো নতুন রাজনীতির ইঙ্গিত হতে পারে না।

৪.
দুই বড় দলের সঙ্গে জোটের নেতাদের প্রার্থী বাছাই নিয়ে যে সমঝোতা, তাও পুরনো রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা অতিক্রম করতে পারেনি। যুক্তফ্রন্ট নেতারা ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, বিএনপির সঙ্গে তাদের বনিবনা না হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, তারা চেয়েছিলেন সংসদে কোনো দলের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত না হোক। বিএনপি সেক্ষেত্রে ১৫০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিতে পারবে না। বাকি আসন জোটের অন্য প্রার্থীদের ছেড়ে দিতে হবে। এই দাবিকে অনেকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। এরকম একটি সংসদ হলে রাজনীতি নতুন বাঁক নেবে বলে কেউ কেউ আশা প্রকাশ করেন। কিন্তু বিএনপি তা মানেনি, যুক্তফ্রন্ট তাতে গোসসা করে। এখন তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচন করতে যাচ্ছে। এবার আর তারা এমন দাবি করেনি। আওয়ামী লীগ ১৫০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিতে পারবে না, যুক্তফ্রন্ট নেতারা কেউ এমন দাবি করেছেন বলে শোনা যায়নি।
দেশের রাজনীতির অন্যতম সংকট হিসেবে অনেকে পরিবারতন্ত্রকে দায়ী করেন। কিন্তু নতুন জোটের প্রক্রিয়া, নতুন দিনের কথা বলা নেতারা, কেউই পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। নেতাদের আত্মীয়-স্বজন, বংশধরদের মনোনয়ন দেয়ার মধ্যে কেউ অস্বাভাবিক কিছু দেখছেন না। আগের ধারাবাহিকতায় এবারের নির্বাচনে দুই জোটই নেতাদের স্বজনদের মনোনয়ন দিতে আগ্রহী। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ সদস্যদের ২৩ জন স্বজন এবার নৌকার মনোনয়ন চেয়েছেন। বিএনপি নেতাদের ৩৭ জন স্বজন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পারিবারিক কোটায় এদের কেউ কেউ মনোনয়ন পেয়েছেন। কেউ কেউ পাননি, তবে তাদেরও আশ্বাস দেয়া হয়েছে দলে পদ দেয়ার।
বিএনপি নেতারা অধিকাংশই স্বজনদের দিয়ে মনোনয়নপত্র কিনিয়েছেন। আইনি জটিলতায় প্রার্থিতা বাতিল হলেও যেন প্রার্থিতা পরিবারের মধ্যে থাকে, এটাই লক্ষ্য। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের এক্ষেত্রে সুযোগ পাওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে দেখা গেল নেতাদের স্বজনরা মনোনয়ন নিচ্ছেন। এছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের আওয়াজ দেয়া ঐক্যফ্রন্টের ক্লিন ইমেজের নেতারাও পরিবারতন্ত্রের বিষয়ে নিশ্চুপ।
জোটের প্রক্রিয়ায় যে দেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের জট আরও বেশি করে পাকবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্যবসায়ী ও আমলাদের তোষণের ক্ষেত্রেও দুই জোটের রাজনীতি একই অবস্থানে আছে। জোটভুক্ত দলগুলো কেউই ব্যবসায়ী ও আমলাদের নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার বিরোধিতা করেননি। তেমনি ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে তোষণের ব্যাপারেও দুই বড় দলের বা জোটভুক্ত ছোট দলগুলো কোনো আপত্তি করেছে বলে জানা যায়নি।
বিদেশ তোষণও এ দেশের রাজনীতির অন্যতম সমস্যা ও পশ্চাৎপদতা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট কোনো জোটই এ নিয়ে তো চিন্তিত নয়ই, উল্টো উভয় পক্ষই বিদেশিদের সহায়তার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। দেশের রাজনীতিতে বিদেশিদের ডেকে আনা, তাদের নাক গলানোর ব্যবস্থাও করে দেয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিদ্বেষ বাংলাদেশে চরম রূপ ধারণ করেছে। কর্মী পর্যায়ে খুনোখুনি, মারপিট তো আছেই, এমনকি শীর্ষ নেতারাও একে অপরের মুখ দেখেন না। মঞ্চে উঠলে নেতিবাচক সব মন্তব্য করেন। কেউ প্রতিপক্ষকে সহ্য করতে পারেন না। এই অবস্থা পরিবর্তনের আলামত কোনো দলের অনুশীলনে দেখা যায়নি বরং মাহমুদুর রহমান মান্নার বক্তব্য নিয়ে সংলাপে প্রশ্ন তুলেছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা।

৫.
দ্বি-দলীয় কর্তৃত্ব নিয়ে শুরুতে যুক্তফ্রন্ট কিছু কথা বলেছে এবং সময় বুঝে তারা চুপও হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুই দলের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে অনেকেই কথা বলেছেন। যারা আজ বিএনপি বা আওয়ামী লীগের জোটে আছেন, তারা অনেকেই বিকল্প ধারা, তৃতীয় শক্তি বা বাম বিকল্প গড়ার চেষ্টায় ছিলেন, আছেন। কিন্তু দেখা গেল ভোটের রাজনীতি হাজির হতে না হতেই তারা দুই দলের জোটে আশ্রয় নিলেন। যারা সরকারের পতনকেই একমাত্র কর্মসূচি মনে করেন, তাদের অবশ্য সরকারবিরোধী দলগুলোর সঙ্গে ইস্যুগত কারণে জোট হবে। কিন্তু যারা সরকার পতনের দাবিতে নেই, তারা কোন অজুহাতে দুই দলের বৃত্তে প্রবেশ করলেন?
অবশ্য একটি জোট জোর গলায় বলতে পারে যে, আমরা তো দুই দলের বৃত্তে যাইনি! তারা হলো বাম জোট। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সঙ্গে ২০১২ সালে জোট গড়ে বাসদ। পরবর্তী সময়ে সিপিবি-বাসদের দ্বি-দলীয় ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চাও। এ বছরের জুলাইয়ে সিপিবি-বাস-বাম গণতান্ত্রিক মোর্চার আটটি দলসহ বৃহত্তর বামপন্থি জোট হিসেবে বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠিত হয়। এই জোটের দাবি সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও এদের লক্ষ্য পরিষ্কার নয়। নির্বাচনে জয় কিংবা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের লক্ষ্য তো কেবল ঘোষণা দেয়ার ব্যাপার নয়। সেক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপও থাকতে হয়, সেরকম কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমরা ২০১৮ সালের ভোটে ছিলাম, এটা বলা ছাড়া এ নির্বাচন নিয়ে পরে তাদের বলার মতো আর কিছু থাকবে না।
তাছাড়া এই জোট ঐক্যবদ্ধ নয়, এর অভ্যন্তরে নানা ইস্যুতে বিভেদ প্রকট। বাম রাজনীতিতে ঐতিহাসিকভাবে বিভেদ ও বিভাজনের যে চর্চা, তা থেকে এরা কোনো শিক্ষা নিতে পেরেছে বলে দৃশ্যমান হয় না। জোটভুক্তরা ২০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার কথা ভাবছে। তবে অধিকাংশ স্থানেই তারা একে অপরের বিপরীতে প্রার্থী দেবে। যদিও তারা প্রচলিত বিধিতে ভোটে যেতে পক্ষপাতি, কিন্তু ভোটারদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টিতে তাদের প্রচেষ্টার অভাব আছে, কারোই কোনো ভোটব্যাংক নেই। দুই বড় দলের জোটে না গিয়ে নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব ধরে রাখা ছাড়া তারা রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য বিশেষ কিছু করতে পারছেন না। সরকারের পতন চাইলেও সরকারবিরোধী আন্দোলনে শক্তিশালী কোনো কর্মসূচি তারা হাজির করতে পারেননি।
অতীতে বামপন্থিদের বিভিন্ন অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেছে। এখনও আওয়ামী জোটে বামপন্থিদের একটি অংশ আছে। এ অবস্থায় বামদের নির্বাচনমুখী বড় অংশটি যদি এমন ধরি মাছ না ছুঁই পানি ধরনের অবস্থান নেয়, জনমনে তার অর্থ দাঁড়ায় ভিন্ন। জনগণ মনে করেন, বামরা আওয়ামী লীগকে ডিস্টার্ব করতে চাইছে না! বাম জোট যদি জনগণের কাছে এমন বার্তা দিতে না চায়, তাহলে তাদের নির্বাচন ও দেশের রাজনীতির বিষয়ে শক্তিশালী, জোরদার অবস্থান নিতে হবে।
জোটের রাজনীতির উদ্দেশ্য ও বিধেয় আলোচনা করতে গিয়ে লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ সম্প্রতি এক কলামে লিখেছেন, ‘ভোটের আগে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট গ্রহণের জন্য জোট গঠন আর জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া দুই জিনিস। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতির জন্য কাজ করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে যেসব রাজনৈতিক দলের নেতারা ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে কাজ করবেন, জাতি তাদের মনে রাখবে। ক্ষমতার জন্য যারা এদল-ওদলের লেজুড়বৃত্তি করবেন, তাদের স্থান হবে ইতিহাসের ডাস্টবিনে।’

৬.
দেশের চলমান ঘটনাবলি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, জাতীয় স্বার্থ দেখার মতো কেউ নেই, নিপীড়িত মানুষের স্বার্থ তো আরও পরের কথা। এক সাক্ষাৎকারে তাই শিক্ষাবিদ ও সমাজ গবেষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মন্তব্য করেছেন, নির্বাচনের এই খেলায় ‘জনগণ যে হারবে সেটা নিশ্চিত। আগেও তারা হেরেছে, এবারও তারা হারবে। এর প্রধান কারণ তাদের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক দল নেই। যারা জিতবে তারা সবাই দেখা যাবে টাকাওয়ালা; সবাই তারা পুঁজিবাদী আদর্শে দীক্ষিত এবং বড় দলের লোক। তাদের টাকা আছে। বস্তুত টাকাই তাদের প্রধান জোর, টাকা না থাকলে তাদের পক্ষে বড় দল থেকে নমিনেশন পাওয়াই সম্ভব হবে না, জেতা তো পরের কথা। নির্বাচন বাণিজ্যে যারা অর্থ বিনিয়োগ করবে তারা সে অর্থ বহুগুণে তুলে নেবে। ওই অর্থ জনগণের, যাদের শ্রমে দেশের অর্থনীতি টিকে আছে। নির্বাচনের পরের দিন থেকেই দেখা যাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণ থেকে দূরে সরে গেছে এবং নিজেদের স্বার্থে জনস্বার্থের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এটাই তো বাস্তবতা।’
বাংলাদেশের রাজনীতি ঘিরে এই হতাশা নতুন কিছু নয়। দুই বড় দলের কাছে কেউই সমাজের খুব বড় মৌলিক কোনো পরিবর্তন প্রত্যাশা করে না। তারা শ্রেণি বৈষম্য, লৈঙ্গিক নিপীড়ন, জাতীয়তাবাদী আস্ফালন বা সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ থেকে মানুষকে মুক্ত করবে, এমনটা কেউ স্বপ্নেও আশা করে না। দেশের মানুষ কী চায়, তা বলা ভার! তবে শিক্ষিতশ্রেণির বড় ও প্রভাবশালী অংশটির মতামত অবশ্য প্রতিনিয়তই সংবাদ মাধ্যমে পাওয়া যায়।
শিক্ষিতরা চান বড় দুই দল সংবিধান মেনে চলুক। তা না পারলেও অন্তত তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি বন্ধ করুক। দুই দলের রাজনীতিবিদদের মধ্যে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কিছু সমঝোতা থাকুক। তারা নিজ দলে দুর্নীতিবাজ, অপরাধীদের আশ্রয় না দিক। দলীয়করণ, নাম পাল্টানোর রাজনীতি বন্ধ হোক। দেশে মতপ্রকাশের ওপর আঘাত ও ধর্মীয় শক্তিগুলোকে তোষণ বন্ধ করা হোক। বিদেশে পুঁজি ও সম্পদ পাচার, বিদেশিদের দেশের রাজনীতিতে ডেকে আনা, ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত থেকে রাজনীতিকরা বিরত থাকুন। আদালত স্বাধীন হোক, পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ হোক। নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে সক্ষম হোক। রাজনীতিবিদরা সমাজ পরিবর্তনের স্লোগান দেন, সুতরাং তারা একটু সৎ হোক। এগুলোই শিক্ষিতশ্রেণির চাওয়া। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধঃপতন থেকে দেশকে বেরিয়ে আনাটাই তাদের লক্ষ্য। আর এটাকেই বলা হয় রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় অবশ্য এসব পরিবর্তন সংস্কারের অংশমাত্র। এতে ব্যবস্থা কিছুটা আরামপ্রদ হবে, তবে কোনো মৌলিক রূপান্তর হবে না। কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা কিছুটা হ্রাস পেলেও রাষ্ট্র আগের মতো শোষণ ও বৈষম্যমূলকই থেকে যাবে। কিন্তু এই যে কর্তৃত্ববাদের অবসান, এইটুকু চাওয়ার সাহস ও পাওয়ার স্বপ্নও জনগণ দেখতে পারছে না। অথচ রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব ছিল, এগুলোকে মূর্ত করা, বাস্তব রূপ দেয়া। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তারা কেবল নিজেদের স্বার্থ দেখছেন। সেটা করতে গিয়ে দেশ, দশ ও রাজনীতির আরও সমস্যা সৃষ্টি করছেন। বিদ্যমান রাজনীতি, নির্বাচনকেন্দ্রিক জোট গঠনের খেলাধুলা রাজনীতিতে কাক্সিক্ষত কোনো পরিবর্তন আনতে পারছে না। আর রাজনীতিতে পরিবর্তন না এলে দেশের ও মানুষের ভাগ্যেও পরিবর্তন আসবে না। এমনকি এর ধারাবাহিকতায় পুরনো জটগুলো আরও জটিল রূপ ধারণ করতে পারে।
তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, মানুষ এসব দেখছে। আর জনগণই যে সমাজের নিয়ন্ত্রক, এটা ইতিহাস বারবারই প্রমাণ করেছে। গণবিরোধী কিছুই টিকে থাকবে না, তারা উৎখাত হবে। যারা গণস্বার্থ রক্ষা করবে না, জনগণও তাদের পাশে থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>