গণপরিবহনে প্রতিনিয়তই নানাবিধ অসুবিধা ও হয়রানির শিকার হয়ে চলেছে নারী যাত্রীরা। সরকারি-বেসরকারি বাসগুলোতে তাদের জন্য সংরক্ষিত আসন থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এ ছাড়া ছোট ছোট যে গণপরিবহন রয়েছে তাতে চড়তেও নারীদের পড়তে হয় বাড়তি বিড়ম্বনাতে। বাসগুলোতে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৯টির মতো সিট বরাদ্দ থাকে, যা কিনা প্রয়োজনের চেয়েও অপ্রতুল…প্রতিটি সরকার নারী সুরক্ষা আর কল্যাণে বেশ আন্তরিক। বেশ সগভের্ বিষয়টা তারা উচ্চারণও করে থাকেন। পুরোপুরিভাবে না হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীর জীবন মান উন্নয়নে ও অগ্রযাত্রায় তাদের আন্তরিকতার চেষ্টা চোখে পড়ার মতো। তথাপিও অযাচিত এবং অনাকাক্সিক্ষত সমস্যা লেগেই থাকে। ঘটতে চলেছে একের পর এক নারী নিগ্রহ ও ভোগান্তির ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে গণপরিবহনে নারীর যৌন হয়রানি ও হত্যা করার বিষয়টিও মিডিয়ায় রীতিমতো হুলস্থুল ফেলে দিয়েছে। গণপরিবহন আজ নারীদের জন্য বিষফেঁাড়া হয়ে উঠেছে। নারীরা এখন আর গৃহবন্দি নয়। নারীদের পথে-ঘাটে চলাফের করতে হয়। আর চলতে ফিরতে গেলেই বিপত্তি বাধে। গণপরিবহনে নিত্য নারীদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। তবে নগরায়নেই সমস্যাটা সবচেয়ে বেশি প্রকট। কেননা, মফস্বলের তুলনায় এখানকার জীবনযুদ্ধ অনেক বেশি বেগবান, অনেক বেশি সচেষ্ট। এ কারণে নারীকে সদা-সবর্দা বাহিরে চলাফেরা করতে হয়। বতর্মান বিশ্বে শিক্ষা ও কমের্ক্ষত্রে নারীর পদচারণা অনেক বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে নারীদের প্রতি সহমমির্তা এবং সহযোগিতাও। তারপরও নগরীতে বসবাসরত কয়েক লাখ নারীকে প্রতিদিন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কমর্স্থলে যাওয়া ও আসার পথে পড়তে হয় নানাপ্রকার ভোগান্তিতে। যার অন্যতম একটি নগরায়নের গণপরিবহন।

জানা গেছে, গণপরিবহনে প্রতিনিয়তই নানাবিধ অসুবিধা ও হয়রানির শিকার হয়ে চলেছে নারী যাত্রীরা। সরকারি-বেসরকারি বাসগুলোতে তাদের জন্য সংরক্ষিত আসন থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এ ছাড়া ছোট ছোট যে গণপরিবহন রয়েছে তাতে চড়তেও নারীদের পড়তে হয় বাড়তি বিড়ম্বনাতে। বাসগুলোতে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য নয়টির মতো সিট বরাদ্দ থাকে, যা কিনা প্রয়োজনের চেয়েও অপ্রতুল। এ ছাড়া ওই আসনগুলো আবার অনেকটাই গাড়ির ইঞ্জিনের কাছাকাছি থাকায় প্রচÐ গরম ও ধেঁায়ায় আছন্ন থাকে বিধায় নারীদের শাসকষ্টসহ নানাবিধ অসুখ হয়ে থাকে। অনেক সময় এসব অস্বাস্থ্যকর সংরক্ষিত আসনগুলোও পুরুষ যাত্রীদের দখল থেকে উদ্ধার করতে নারীদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। আসন না থাকলে নারীদের বাসে না উঠাতে চালক ও চালকের সহকারীদের নিদের্শও দেন কোনো কোনো যাত্রীরা। সংরক্ষিত নয়টি আসন ছাড়া অন্য আসনে বসলেও অনেক পুরুষযাত্রী তকর্-বিতকর্, বিদ্রƒপ শুরু করেন। যানবাহনে ওঠার ক্ষেত্রে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেয়ার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা খুব একটা নজরে পড়ে না। এমনকি কখনো কখনো চালক আর সহকারীরা নারী আসন থাকলেও অনেক সময় তাদের বাসে উঠতে দিতে চায় না। বিশেষ করে ব্যস্ত কমর্ঘণ্টাগুলোতে কমর্জীবী নারী ও শিক্ষাথীের্দর গন্তব্যে যাওয়ার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করে গণপরিবহনে জায়গা করে নিতে হয়। পুরুষদের পাশাপাশি ধাক্কাধাক্কি করে বাসে ওঠা, দঁাড়িয়ে বা বাসের পাদানিতে ঝুঁকি নিয়ে ঝুলে যাতায়াত করতে হচ্ছে নারীদের। পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যানবাহনে উঠতে গিয়ে প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানিসহ নানারকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন নারীরা। বাসে ওঠা-নামার সময় শরীরের বিভিন্ন অংশে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃতভাবে লাগছে চালক সহকারীর হাত। কিছু পুরুষ যাত্রী ইচ্ছা করে নারী যাত্রীদের গায়ের ওপরে পড়ে যান কিংবা অপ্রয়োজনে গায়ে হাত দেন। বাসের পেছনে ফঁাকা থাকলেও সামনের দিকে নারী আসনগুলোর পাশে গা-ঘেঁষে দঁাড়িয়ে থাকেন এবং চালক সহকারীরা পেছনে যেতে বললে তাদের বাজে ভাষায় গালাগালও করেন অনেকে। তবে ছোট পরিবহনগুলোতে নারী ভোগান্তির চিত্রটা একটু কম। তারা নারীদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই বের হবার দরজার সঙ্গে তাদের বসার জায়গা করে দেয়। এতে ভেতরের দিকে বসা যাত্রীদের আগে নামতে হলে নারী যাত্রীদের ওপর দিয়ে নামা ছাড়া উপায় থাকে না। এই বোরিংটুকুই পোহাতে হয়।

মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারী যাত্রীর সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু বাসে নারীদের জন্য সিটসংখ্যা বাড়ছে না। নারী যাত্রীর জন্য বিআরটিসি কিছুদিন আগেও আটটি বাস চালু রেখেছিল; কিন্তু পযার্প্ত নারীযাত্রী নেই, তাই লস দিতে হচ্ছে- এমন অজুহাতে বাসগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও ওই আটটি বাসও নারীদের জন্য রাজধানীতে অপযার্প্ত ছিল। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাজধানীর ৭৩টি মোড়ে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় ভিড় থাকে। এ ভিড়ের মধ্যে নারী যাত্রীদের পোহাতে হয় এসব সমস্যা। অপরাধী অপরিচিত হওয়ায়ও আমাদের সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীদের এসব ভোগান্তি মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া উপায় থাকে না।শুধু পুরুষ যাত্রী নয় বাসের চালক ও হেল্পারদের আচরণও নারীদের জন্য যথেষ্ট বিব্রতকর। নারীদের অসম্মান বা বিব্রত করার সস্তা একটা ধরন হলো, নারীদের উদ্দেশ্য করে বা তাদের সামনে অশ্লীল শব্দ, বাক্য ও অঙ্গভঙ্গি করা। এ বিষয়ে লোকাল বাসের ড্রাইভার ও হেল্পাররা বেশ পারদশীর্। এখনকার শিক্ষিত সচেতেন তরুণরা এ ব্যাপারে বেশ ভদ্র। তবে শ্রমিকশ্রেণির লোকেরা গায়েপড়ে নোংরামী করে। এটাকে যৌন হয়রানি ছাড়া অন্য কোনোভাবেই অভিযুক্ত করা যায় না। প্রতিনিয়ত নারীযাত্রীরা এভাবে হয়রানির শিকার হলেও নীরব প্রশাসন। নেই বিকল্প কোনো উদ্যোগ। গত ৬ মাচর্ ২০১৮ জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুঘর্টনামুক্ত সড়ক’ শীষর্ক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময় মৌখিক, শারীরিক ও অন্যান্য যৌন হয়রানির শিকার হয়। অনুষ্ঠানে আরও দৃঢ়তার সহিত বলা হয় মূলত ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষের দ্বারাই নারীরা বেশি যৌন নিযার্তনের শিকার হয়। এ হার ৬৬ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিল থেকে জুন পযর্ন্ত গবেষণা করে এ তথ্য দেয়া হলো। এতে সংখ্যাগত ও গুণগত ভিত্তিতে ৪১৫ জন নারী অংশগ্রহণ করেন।নিম্ন ও নিম্ন মধ্য আয়ের পরিবারের নারীদের সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবহারের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৫ শতাংশ নারী যৌন হয়রানি এবং ৫৯ শতাংশ নারী ২৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী পুরুষের দ্বারা যৌন নিযার্তনের শিকার হয়েছেন। শারীরিক এবং যৌন হয়রানির মধ্যে রয়েছে ইচ্ছাকৃত স্পশর্ করা, চিমটি কাটা, গায়ে গা লাগিয়ে দঁাড়ানো, ধাক্কা দেয়া, চুল স্পশর্ করা, হাত বুক বা শরীরের অন্যান্য অংশ দ্বারা নারীদের স্পশর্ করা। এসব ঘটনায় ৮১ শতাংশ নারী চুপ থাকে এবং ৭৯ শতাংশ নারী জায়গা থেকে সরে দঁাড়ায়। রাজধানীতে কমর্জীবী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী নারীদের জন্য গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ছে না। কমর্জীবী নারীদের জন্য রাজধানীর ৪টি রুটে বাস চলাচল করে। একটি ছাড়া সব কয়টির গন্তব্যই মতিঝিল। বাসগুলো সকাল ৭টায় ছাড়ে। মতিঝিল থেকে ফিরে বিকেল ৫টায়। গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নেই বললে ভুল হবে না।এ সমস্যা সমাধানে সরকারিভাবে প্রতিটি স্তরে জোরালো মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে গণপরিবহনে নারীদের হেনস্তার হার অনেকাংশে কমবে। গণপরিবহনে উঠতে না দেয়া, নারী যাত্রীদের গণপরিবহনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে আরও একটি বাধা নারীদের। সিট না থাকার অজুহাতে তাদের প্রায়শই গণপরিবহনে ওঠানো হয় না। নারী যাত্রীদের অভিযোগ, অধিকাংশ সময়ে রাতে নারী যাত্রীরা গণপরিবহনে স্থান পায় না। এক্ষেত্রে গণপরিবহণে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত ৯টি আসন খুবই অপযার্প্ত। এসব ক্ষেত্রে মেয়েদের শক্ত হয়ে কথা বলতে হবে। দৃঢ়চিত্তে অধিকার আদায়ের কথা উচ্চারণ করতে। নারীবাদী আন্দোলন আর প্রেস ব্রিফিং করে জনশ্রæতি বাড়ানো যায়, কিন্তু ক্ষতি পোষানো যায় না। এই হীনম্মন্যতার ক্ষতি পোষাতে হলে নারীদের আলাদা না করে অন্য যাত্রীদের মতো ভাবতে হবে। গণপরিবহনে নারীযাত্রীদের ভোগান্তি লাঘবে পুরুষরা যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, নারীদের যাতায়াতের সমস্যা সমাধানে তা অতি গুরুত্বপূণর্ ভূমিকা রাখবে। এ সংক্রান্ত সমস্যা লাঘব করা সম্ভব হবে। পুরুষ যাত্রীরা নারী যাত্রীদের নারী হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে গণ্য করলেই সমস্যার দ্রæত সমাধান হবে। তাই আসুন নিজেদের মানসিকতা বদলাই, বদলাতে সাহায্য করি আমাদের এই সমাজকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>