-গোলাম মোর্তোজা-

উপদেষ্টা, মন্ত্রী, আমলারা নানা রকমের কথা বললেও, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নিজে সম্পৃক্ত হয়েছেন। প্রথমবার সংসদে, দ্বিতীয়বার সংবাদ সম্মেলনে খুব পরিষ্কার করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘কোটা থাকবে না’। তারপরও কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাদের হত্যার হুমকি দিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতারা। কয়েকদিন আগে ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়ে গেল নেতৃত্ব ঘোষণা ছাড়া। কারা নেতৃত্বে থাকবেন সেই ঘোষণা দেবেন প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেতা শেখ হাসিনা।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাদের ছাত্রলীগ কর্তৃক হত্যার হুমকি প্রসঙ্গে কিছু কথা।
১. কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুরু ও রাশেদ খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মহসিন হলের ১১৯ নম্বর রুমে থাকেন নুরুল হক নুরু। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৬ মে রাত দেড়টার দিকে ছাত্রলীগ নেতারা নুরুর রুমে এসে হত্যার হুমকি দেন রাশেদ ও নুরুকে। রাশেদ তখন নুরুর রুমে ছিলেন। ইমতিয়াজ উদ্দিন বাপ্পী, মেহেদী হাসান সানী, ফাহিম লিমনসহ প্রায় পনের-বিশজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী এসে নুরু ও রাশেদকে হত্যার হুমকি দেন। ইমতিয়াজ উদ্দিন বাপ্পী বলেন, ‘আন্দোলন করছিস তোরা সরকারের বিরুদ্ধে। তোদের একটাকেও ছাড়া হবে না। প্রজ্ঞাপনটা জারি হলে তোদের কুত্তার মতো পিটানো হবে। কুকুরের মতো গুলি করে রাস্তায় মারা হবে’।
২. এর পরের ঘটনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। জিডি করতে গেলে শাহবাগ থানা তাদের আধাঘণ্টা বসিয়ে রেখেও জিডি নেয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর পর্যন্ত নুরুরা পৌঁছাতে পারেননি। ফোন করে তাকে পাননি। দু’একটি গণমাধ্যম প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রক্টর গোলাম রাব্বানী বলেছেন, ‘অফিসিয়ালি কেউ অভিযোগ করেনি।’
৩. মন্ত্রী-আওয়ামী লীগ নেতারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতি সরকারের ‘সহানুভূতি’র কথা বলছেন। দাবি যৌক্তিক বলেই তাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করছেন। কয়েকদিন আগেও রাস্তা অবরোধ করার পর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের জানানো হয়েছে, প্রজ্ঞাপন জারির কাজ চলছে। অল্প সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এর দু’একদিন আগে একজন উপদেষ্টা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাদের ‘শিবির’ বলেছেন। ছাত্রলীগ তাদের ‘কুত্তার মতো গুলি করে’ হত্যা করতে চাইছে। প্রক্টর তার শিক্ষার্থীদের হত্যার হুমকির পর ‘অফিসিয়াল’ অভিযোগের জন্যে বসে আছেন। থানা জিডি নিচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে নিরাপত্তা চাইছেন।
মানুষ রেগে গিয়ে অনেক সময় ‘খুন করে ফেলব’ বলে, যা তিনি হয়তো কোনো দিন করবেন না। ছাত্রলীগের হুমকিও কী এমন রাগ বা ক্ষোভের প্রকাশ? জিডি বা চিন্তিত হওয়ার কারণ আছে? আছে। ছাত্রলীগের জন্যে ‘খুন করে ফেলা’ মোটেই কঠিন বা অসম্ভব কিছু নয়। গত কয়েক বছরে ছাত্রলীগ নিজেরা নিজেরা সংঘর্ষে জড়িয়ে নিজেদের প্রায় ৬২ জন নেতাকর্মীকে নিজেরা হত্যা করেছেন। ছাত্রলীগের হাতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরু, রাশেদ বা অন্যরা যদি হত্যাকা-ের শিকার হন, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সুতরাং রাষ্ট্রের উচিত তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৪. দাবি যত যৌক্তিকই হোক না কেন, তা আদায়ের জন্যে এদেশে আন্দোলন করতে হয়। সেই আন্দোলন যদি আবার শান্তিপূর্ণ হয়, সরকারের কাছে তা গুরুত্ব পায় না। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে যদি অরাজকতা তৈরি হয় বা করা যায়, তখন সরকারের কাছে গুরুত্ব পায়। আবার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকেও দমন করার মানসিকতা দিয়ে, অনেক ক্ষেত্রে সহিংস রূপ দেয় সরকার। দীর্ঘদিন ধরে কোটা সংস্কারের চলমান আন্দোলনটি যে সহিংস রূপ লাভ করল এর কৃতিত্ব সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও ছাত্রলীগের।
প্রধানমন্ত্রী তাদের দাবি মেনে নিতে চাওয়ার পরও কেন শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন, পরীক্ষা-ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিলেন? বিষয়টি নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা বর্জনের জায়গা থেকে সরে আসলেও, ক্লাস বর্জন অব্যাহত রেখেছেন। কেন তাদের আবার আন্দোলন করতে হচ্ছে, সেই প্রশ্নের বিষয়ে আসি।

ক. প্রধানমন্ত্রীর ‘কোটা থাকবে না’ ঘোষণার পর সময় যেতে থাকল। আমলারা বারবার বললেন, ‘আমরা কিছু জানি না। নির্দেশনা আসেনি’। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়তে থাকল। তারা আবার আন্দোলনের ডাক দিতে চাইলেন, সংবাদ সম্মেলন করলেন। সরকারের কর্তারা আন্দোলরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে সময় নিলেন। একমাস গেল, ৭ মে ডেটলাইন গেল। মন্ত্রীরা বললেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে। যারা বাস্তবায়ন করবেন, সেই আমলারা বললেন, ‘নির্দেশনা আসেনি’।
খ. আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শাহবাগের রাস্তা অবরোধ করলেন। কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে আবার আন্দোলন শুরু হতে থাকল। সরকারের প্রতিনিধিরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে জানালেন, ‘কাজ চলছে প্রজ্ঞাপন জারির। একটু সময় লাগবে’।
গ. বিষয়টি লক্ষণীয়। রাস্তা অবরোধ করার পরে ঘোষণা এলো ‘কাজ চলছে’। প্রশ্ন হলো, রাস্তা অবরোধ করার আগে, জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত কেন ঘোষণা দেওয়া গেল না যে ‘কাজ চলছে’?
ঘ. সরকারের মন্ত্রীরা বারবার বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কথায় ভরসা রাখতে। অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর কথায় ভরসা রাখতে হবে। নিশ্চিত করেই বিশ্বাস করি প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, সেই অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি হবে। প্রশ্ন আসে তাহলে, ছাত্রলীগ কেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হুমকি দিচ্ছে, নির্যাতন করছে? যে মন্ত্রীরা বলছেন অল্প সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি হবে, তারা কেন ছাত্রলীগের নির্যাতন বিষয়ে নীরব থাকছেন? কুমিল্লায় ছাত্রলীগ কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের আক্রমণ করেছে, ঢাকায় হত্যা করতে চাইছেন, কেন? সে বিষয়ে নেতা-মন্ত্রীরা কথা বলছেন না কেন? কেন ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করছেন না? শাহবাগ থানা কেন জিডি নিল না, সরকারে কি এমন কেউ নেই, যিনি বিষয়টি দেখতে পারেন?
ঙ. মাঝরাতে হল থেকে ছাত্রীদের বের করে দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। লেজেগোবরে অবস্থা করে মুখ রক্ষার চেষ্টা করেছেন। এখন আবার আরেকটি হযবরল অবস্থা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। আন্দোলনরত বেগম সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রীদের আবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। প্রায় মীমাংসিত একটি বিষয়কে আবার জীবন্ত করছেন। শিক্ষার্থীদের হত্যার হুমকি দিলে যে প্রক্টর বলেন, ‘অফিসিয়ালি’ জানি না, তিনি ছাত্রদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে আইন প্রতিষ্ঠা করছেন।
৫. অযোগ্যদের হাতে দায়িত্ব পড়লে তারা তা পালন করতে পারেন না। বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার সবচেয়ে কার্যকর উদাহরণ।
ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের জন্যেও এই উদাহরণ প্রযোজ্য। ‘নির্বাচনে’র মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ‘যোগ্যরা’ আসেনি। এখন প্রধানমন্ত্রী নিজে ‘যোগ্য’ নেতা বাছাই করবেন। বিশ্বাস করতে চাইব, সেই ‘যোগ্য’ নেতারা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের হত্যার হুমকি দেবেন না। নিজেরা নিজেদের নেতাকর্মীদের হত্যা করবেন না। চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস, এবং তদবির বাণিজ্য থেকে দূরে অবস্থান করবেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>