আবারও ক্রসফায়ার
এ অবস্থার অবসান হোক
আবারও সংবাদ শিরোনাম হয়ে এসেছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের বিষয়টি। গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, গত এপ্রিল মাসে ২৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে পুলিশের হাতে ২৩ জন আর ৫ জনর্ যাবের হাতে। এই তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্ত্মবায়ন সংস্থার মাসিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা অনুযায়ী দেশে নারী ও শিশুর সম্ভ্রমহানি, হত্যা এবং আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনক। একটি রাষ্ট্রে এরকম বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- যেমন কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না, তেমনইভাবে অন্যান্য অপরাধ বৃদ্ধির ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্রই সামনে আনে। ক্রসফায়ার অর্থ ‘টার্গেট কিলিং’, যা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেই ঘটে। আর এটা যে এ বাহিনীর ইচ্ছাকৃত হত্যা, বিষয়টি নিয়ে বহুল আলোচনা হয়েছে। এমন হত্যাকা- বন্ধে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরকারকে অনুরোধ করা সত্ত্বেও পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটেনি। সঙ্গত কারণেই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জনমনে।
সরকার যখন বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হয় এবং সমালোচনার মুখে পড়ে তখন ‘ক্রসফায়ার’ এক ধরনের আইওয়াশ হিসেবে কাজ করে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্ত্মব্য করেন। আইনের দৃষ্টিতে সবাই যেহেতু সমান এবং সব নাগরিকের সমানভাবে আইনের আশ্রয় পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার আছে। তাহলে কেন এই হত্যাকা– এমন প্রশ্নও অযৌক্তিক হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রে যে কোনো কারণে অপরাধ বাড়তে পারে, এ জন্য উদ্ভুত পরিস্থিতি নিরসনে সংশিস্নষ্টদের কর্তব্য হওয়া দরকার কঠোর উদ্যোগ নেয়া। বিচার বিভাগ শক্তিশালী ও স্বাধীন করার মাধ্যমে আইনের শাসন নিশ্চিত করা। তাহলেই অপরাধ কমে যাবে। ক্রসফায়ার কোনো সমাধান নয়, বরং এটি বিনা বিচারে হত্যা যা সমাজে গুম-খুন উস্কে দেয়- এ ব্যাপারেও দ্বিমত থাকা সমীচীন নয়।

বিচারবহির্ভূত হত্যা মানেই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, অনেকবারই সামনে এসেছে এমন বিশেষজ্ঞের মত। ফলে আমরা আশা করব, সংশিস্নষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে যতদূর সম্ভব আইনের শাসনের নীতি সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট হবেন। শুধু বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ই নয়- সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে ৫৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তা ছাড়া ৭ জন নারী ও ৮ জন শিশু গণধর্ষণেরও শিকার হন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৬ জনকে। অন্যদিকে যৌন হয়রানি ও আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এপ্রিল মাসে সন্ত্রাসীর হাতে নিহত হয়েছেন ১৫৫ জন ও আহত হয়েছেন ৩৭ জন। ভুল চিকিৎসায় মারা গেছে ১১ জন। জঙ্গি ও সন্ত্রাসী দমন অভিযানের নামে গণগ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন ১২৪৮ জন আর নিখোঁজ হয়েছেন ৯ জন। সব মিলিয়ে প্রতিবেদনের তথ্যে উঠে আসা অপরাধের ঘটনাগুলো যে অত্যন্ত্ম আতঙ্কজনক বাস্ত্মবতাকেই নির্দেশ করছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইনের সঠিক প্রয়োগ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ, অপরাধীদের দৃষ্টান্ত্মমূলক শাস্ত্মি, নৈতিক অবক্ষয় রোধে বিভিন্ন পর্যায়ে কাউন্সিলিং, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতাবিষয়ক প্রশিক্ষণ, ভালো কাজের জন্য পুরস্কার ইত্যাদি কর্মকা-ের মাধ্যমে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব হতে পারে। আমরা মনে করি, আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়াই আইনের শাসনের পূর্বশর্ত। আমরা সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে শাস্ত্মির বিধান নিশ্চিত করা হোক। ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার অথবা বন্দুকযুদ্ধ যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন বিনাবিচারে মানুষ হত্যার এই প্রক্রিয়া চলতে পারে না। বিচারবহির্ভূত হত্যার এ প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হতে থাকবে যা দেশ-জাতির জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক হতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>