শান্ত্মি, সুশাসন, শোষণহীন, সুশীল, দুর্নীতি, নিপীড়ন, শোষণহীন ও সুশাসিত দেশের প্রত্যাশায় ‘৭১এ দেশের সর্বসাধারণ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। পাকিস্ত্মান থেকে বাংলাদেশ। একটি স্বাধীন ভূখ-। কত ত্যাগ, কত সম্ভ্রমহারা, কত রক্ত, এরপর বিজয়! আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা, ঘটেছে মানচিত্রের পরিবর্তন। কিন্তু চরিত্রের কোনো পরিবর্তন ঘটেছে কি? হয়েছে কি দুর্নীতি ও নিপীড়নের শ্বাসরোধী অবস্থা থেকে দেশবাসীর মুক্তি? জাতিসংঘ ৯ ডিসেম্বরকে আন্ত্মর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ দিবসটিতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়ে থাকে। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত্ম পরপর ৫ বার দুর্নীতির সূচকে শীর্ষে অবস্থান করে। দুর্নীতি সংক্রান্ত্ম প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বরাবরই লক্ষ্য করা গেছে সরকারি মহল অসন্ত্মোষ প্রকাশ করে। টিআইবির চেয়ারপারসন হোসে কারলোস ইতিপূর্বে বাংলাদেশ সফরে এসে অনেক কথার সঙ্গে খুবই গুরম্নত্বপূর্ণ একটি কথা সরকারের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আমরা সরকারের শত্রম্ন নই, আমরা দুর্নীতিবাজদের শত্রম্ন’।
দেশের প্রতিটি নির্বাচনের ইশতেহারে শীর্ষ দল এবং জোটের সুশাসন, দারিদ্র্য এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের অঙ্গীকার থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বাস্ত্মবায়ন আমরা দেখি না। বলা হয় দরিদ্র্যের কারণে অনেকে দুর্নীতিগ্রস্ত্ম হয়। বাস্ত্মবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় উচ্চপদাধিকারী, শিক্ষিত, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক এবং সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরাই অধিক দুর্নীতিগ্রস্ত্ম। এই উচ্চবিত্তদের দুর্নীতি যে দারিদ্র্য বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ ও দুর্নীতি বিমোচনে প্রধান অন্ত্মরায় তাতে সন্দেহ নেই। এ জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন ঘুষ-দুর্নীতি ও সাংঘর্ষিক রাজনীতি পরিহার।

সরকার প্রথমবারের মতো হতদরিদ্রের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে ৫০ লাখ পরিবারের মাঝে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেয়ার কর্মসূচি নিয়েছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিগত দিনগুলোতে এই কর্মসূচির যে চিত্র বেরিয়ে এসেছিল তা চরম দুঃখ, লজ্জা ও হতাশাজনক। শাসক দলের নেতা-কর্মী-সমর্থক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, তাদের আত্মীয়স্বজন, সরকারী কর্মচারী, স্কুল-কলেজের শিক্ষকসহ অনেকেই এই চাল ভাগবাটোয়ারা করে খেয়েছে। নৈতিকতার অবক্ষয় কোন পর্যায়ে নেমে গেছে তা গবির, দুঃখী, দুস্থ’, ভিখারী, অনাহারীদের চাল বিক্রির ঘটনা থেকে বুঝা যায়। যাতে বিবেকবান মানুষমাত্রই ঘৃণায় শিহরিত হয়েছে।
ইতোপূর্বে স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও সংগঠনকে পুরস্কার দেয়ার আয়োজন করেছিল সরকার। এই বিদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা স্মারক হিসেবে দেওয়া ক্রেস্টে স্বর্ণ জালিয়াতি করা হয়েছিল। আমলাতন্ত্র ও শোষক ছাউনির উচ্চাভিলাষে প্রমাণ হয়েছে, মানুষের অসীম-অনন্ত্ম চাহিদা বা নিজের কু-মানসিকতা তাকে নিয়ে যায় এক অন্ধ জগতে। এতে প্রমাণ হয় দুর্নীতির প্রধান ক্ষেত্র সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন খাতে অপ্রতিরোধ্যভাবে বিস্ত্মার লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি, তেলের খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি। যারেই যেখানে দায়িত্ব দেই, সে কেবল চুরি করে’।
দেশের বড় বড় আমলা ও রাজনীতিকদের দুর্নীতির বিচার হয় না বা সম্ভবও নয় তা প্রমাণিত। দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান তার অসহায়ত্বের কথা বলেছিলেন ক্ষমতা থেকে চলে আসার পর। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কিন্তু তিনি তার অসহায়ত্বের কথা বলেননি। পরে তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেন ১০০ বা ৫০০ রাজনীতিবিদদের যদি জেলে ভরতে পারতাম তাহলে বোধহয় আমি সফল হতাম। তার এই রিয়ালাইজেশন নিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি তাহলে সেটি কেন করেননি?
এখন চাকরি ক্ষেত্রে মেধার মূল্যায়ন নেই, লাগে ঘুষ কিংবা মামা-ভাগ্নের সম্পর্কের মতো জাদুর ছোঁয়া। একটা মেথর, খালাসী নিয়োগ থেকে শুরম্ন করে সবরকম নিয়োগে চলে বাণিজ্য আর অপরিসীম দুর্নীতি। ঠিকাদারদের মন্ত্রী, আমলা, ইঞ্জিনিয়ার, স্থানীয় মাস্ত্মানদের পার্সেন্টিস ও চাঁদা দিয়ে কাজ করতে হয়। ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়বে না। অবৈধ লোন দিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের পয়সা কামানো। জাল সার্টিফিকেটে শিক্ষকতা, ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। এমনিতর শতসহস্র বাঁধ ভাঙা অনৈতিক ঘটনা এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এসবের কথা ভাবলে মনে হয়, ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেব কোথা’। বাংলাদেশের দুর্নীতির গল্প ঠিক আরব্য রজনীর গল্পের মতো। রাত ফুরিয়ে ভোর হবে, কিন্তু সীমাহীন দুর্নীতির গল্প যেন শেষ হওয়ার নয়, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম অন্ত্মরায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>