আজ আমাদের জননী, ভগিনী, জায়া, তনয়া সকলেই ভীত-সন্ত্রস্ত। পুরুষ তার কর্কশ কামনার শিকারে পরিণত করছে নারীকে। পুরুষ আসুরিক শক্তি দিয়ে নারীকে বলাৎকারের যে অপসংস্কৃতি তৈরি করেছে এই অপসংস্কৃতি অবশ্যই মুছে দিতে হবে। এ জন্য জাগ্রত করতে হবে মানবিকবোধ। নন্দন চর্চার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। আজ আমরা অর্থকরী শিক্ষাকে এত বেশি মূল্য দিচ্ছি যে মানবিক শিক্ষার দিকে কেউ দৃষ্টিই দিচ্ছি না। মানবিক শিক্ষার দিকে ফিরে না তাকালে মানবতা লুণ্ঠিত হবে, কায়েম হবে পশুর রাজত্ব।

একবিংশ শতাব্দী মহাবিস্ময়ের কাল। প্রতিদিন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পাশাপাশি তথ্য-প্রযুক্তিতে আসছে চোখ ধাঁধানো পরিবর্তন। শুধু উন্নত দেশগুলোতেই নয়, উন্নয়নশীল বা কম উন্নত দেশেও প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষণীয়। আজ আমরা প্রযুক্তি ব্যবহারে পারঙ্গম হচ্ছি বটে, কিন্তু মানবিকতা অর্জনের ক্ষেত্রে যেন পিছিয়ে যাচ্ছি অনেকখানি দূরে। এখন আমাদের দুটো বিষয় সমানতালে এগিয়ে নেয়া দরকার_ এক. বিজ্ঞানচর্চা, দুই. শিল্প-সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্বের চর্চা। যুগের দাবি যথার্থভাবে পূরণ করতে হলে এ দুটোর সমন্বয় আমাদের ঘটাতেই হবে। তা নাহলে যন্ত্র ব্যবহার করে করে আমরা হয়তো একদিন যন্ত্রই হয়ে যাব, হারিয়ে ফেলব মনুষ্যত্ব।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি পাশবিক ঘটনা ঘটেছে, যা মানুষের মনে বিশেষ করে নারীদের মনে আতঙ্কের স্থায়ী ছাপ ফেলে দিয়েছে। আমাদের সমাজে পাশবিকতা প্রদর্শনে পুরুষরাই এগিয়ে আছে এ কথা বললে কে, কি মনে করবেন জানি না, তবে পত্র-পত্রিকার পরিসংখ্যানগুলো অন্তত সেই সত্যটাই প্রকাশ করছে। নারীর প্রতি ও শিশুর প্রতি ঘটমান অন্যায়-অবিচারগুলোর খ-চিত্র বারবার মধ্যযুগীয় বর্বরতার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। আমাদের নারীগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ নয়, বন্ধু-বান্ধবের ঘরে নিরাপদ নয়, এমনকি কর্মস্থল কিংবা ক্যান্টনমেন্টের মধ্যেও মৃত্যু এসে তাদের কামড়ে ধরছে। পশুত্বের ভয়াল থাবা সর্বত্রই আজ হিংস্রতার মহড়া দিয়ে যাচ্ছে। পশুত্বকে পরাজিত করতে হলে এখন প্রয়োজন জোরেশোরে মনুষ্যত্বের পরিচর্যা করা। মনুষ্যত্বই পারে পশুত্বকে হটিয়ে শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত করতে। আমরা যদি পারস্পরিক সৌহার্দ্য চাই, ঐক্য চাই; চাই যদি বাসযোগ্য সমাজ কাঠামো, তাহলে মানবতার নিভন্ত প্রদীপটাকেই উসকে দিতে হবে। অনির্বাণ আলো জ্বালাতে হবে প্রীতির ও সহমর্মিতার। হিংসার কুশায়া ছিন্ন করে ভালোবাসার আলোকিত প্রান্তরে যাত্রা শুরু করতে হবে এখনই। এই কাজটি করতে যদি আমরা অবহেলা বা আলসেমি করি, তাহলে আমরা শুধু সুন্দর জীবনেরই কবর খুড়ব না, মৃত্যু-উপত্যকায় রূপ নিবে গোটা মানবসমাজ।

বনানীর রেইনট্টি হোটেলে সংঘটিত ধর্ষণ মামলার রেশ কাটতে না কাটতে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে গেছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে যেই ঘটনাটি জনমনে ভীষণ অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে সেটা হলো বগুড়ার ছাত্রী ধর্ষণ ঘটনা। নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে এক ছাত্রীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় তুফান সরকার নামে শ্রমিক লীগের এক প্রভাবশালী নেতা। সে শুধু তুলে নিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, সেই ছাত্রীকে ধর্ষণ করে। নির্যাতন করে ছাত্রীটির মাকেও। নির্যাতনের পরে ছাত্রী ও ছাত্রীটির মাকে মাথা ন্যাড়া করে বগুড়া ছাড়ার হুমকি দেয় ধর্ষক ও তার ক্যাডার বাহিনী। ধর্ষক তুফান সরকারের সঙ্গে তার স্ত্রী ও এক মহিলা কাউন্সিলরও নির্মম নির্যাতন চালায় ওই মা-মেয়ের ওপর। পুলিশ গ্রেপ্তার করে তুফান ও তার তিন সহযোগীকে। অন্যরাও আটকা পড়ে পুলিশের জালে। অবশ্য পুলিশ যদি কাউকেও আটক না করত তবু বিস্মিত হতাম না। তার কারণ হলো_ ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের এখনো কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। আর কখনো পারবে বলেও কেউ আশা করে না। তনুর আগে আরেকটি লোমহর্ষক ধর্ষণ ঘটনা ঘটে রাজধানীতে_ যে ঘটনা লোকমুখে ‘মাইক্রোবাসে ধর্ষণ’ নামে পরিচিত। ২১ বছর বয়সি এক গারো তরুণী তার কর্মস্থল থেকে রাতের বেলা বাসায় ফিরছিল, এমন সময় তাকে পাঁচ যুবক জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তোলে। পরে ওই পাঁচজনই ধর্ষণ করে গারো তরণীকে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গারো তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় দুই-একজনকে আটক করলেও পরে আর কোনো খবর শোনা যায়নি। মানুষ এখন জানেই না সেই ধর্ষণ মামলা এখনও সচল আছে নাকি অচল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র (ছাত্রলীগের সদস্য) বদরুল চাপাতি দিয়ে পাশবিকভাবে জখম করে খাদিজা নামের এক ছাত্রীকে। দিনের আলোতে এমন ঘটনা বাংলাদেশে বোধহয় এটাই প্রথম ছিল। খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয় খাদিজার বিস্ময়কর মামলাটি। বদরুল পবিত্র বিদ্যাপীঠে পাশবিকতার যে পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশের কোনো নারী তা কোনোদিন ভুলতে পারবে না।
নারীর প্রতি সহিংসা নতুন কিছু নয়। সবদেশে সব কালেই নারীকে নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। নারীর প্রতি নির্যাতনের মূল কারণ পুরুষের যৌন লালসার নিবৃত্তি। পুরুষ নারীকে ভোগ করতে চায়_ সেই ভোগে বাধা পেলেই পুরুষ হিংস্র হয়ে ওঠে। পুরুষের সেই হিংস্রতা রূপ নেয় হত্যাকা-ে। আগে যে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন হতো না, তা নয়। তবে বর্তমান সময়ে ধর্ষণের সঙ্গে হত্যাপ্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুধের শিশু থেকে চলৎশক্তিহীন বৃদ্ধা কেউ-ই রক্ষা পাচ্ছে না পশুত্বের থাবা থেকে, কেন এমনটি হচ্ছে তা আমাদের অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে।
সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত ‘নারী’ কবিতায় উচ্চারণ করেছেন_ ‘জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী নারী./সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি’/পুরুষ এনেছে দিবসের জ্বালা তপ্ত রৌদ্রদাহ,/কামিনী এনেছে যামিনী-শান্তি, সমীরণ, বারিবাহ!/দিবসে দিয়াছে শক্তি-সাহস, নিশীথে হয়েছে বধূ,/পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে, নারী যোগায়েছে মধু।’
কবির কবিতা যদি আমরা সত্যি বলে মানি, তাহলে যে নারী সুষমা লক্ষ্মী, যে নারী শক্তির আধার ও আনন্দের সঙ্গী তাকে পুরুষ কোন নেশায় মত্ত হয়ে নির্যাতন করার স্পর্ধা দেখায়? যে নারী ছায়া দিয়ে, মায়া দিয়ে, নিজেকে নিঃশেষ করে পুরুষকে সুখী করে, তার প্রতি নির্যাতন-নিপীড়ন চালাতে একবারও কি অন্তর কেঁপে ওঠে না পাষাণ পুরুষের?
আজ আমাদের জননী, ভগিনী, জায়া, তনয়া সকলেই ভীত-সন্ত্রস্ত। পুরুষ তার কর্কশ কামনার শিকারে পরিণত করছে নারীকে। পুরুষ আসুরিক শক্তি দিয়ে নারীকে বলাৎকারের যে অপসংস্কৃতি তৈরি করেছে এই অপসংস্কৃতি অবশ্যই মুছে দিতে হবে। এ জন্য জাগ্রত করতে হবে মানবিকবোধ। নন্দন চর্চার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। আজ আমরা অর্থকরী শিক্ষাকে এত বেশি মূল্য দিচ্ছি যে মানবিক শিক্ষার দিকে কেউ দৃষ্টিই দিচ্ছি না। মানবিক শিক্ষার দিকে ফিরে না তাকালে মানবতা লুণ্ঠিত হবে, কায়েম হবে পশুর রাজত্ব।
পশুর স্তর থেকে ধীরে ধীরে মানবিকতার স্তরে ওঠে এসেছে মানুষ। বিবর্তনের ইতিহাস বলে_ পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে কোটি কোটি বছর। কোটি কোটি বছরের সাধনায় মানুষ যে মনুষ্যত্ব অর্জন করেছে আজ সেই মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে মানুষ কি আবার পশুস্তরে ফিরে যেতে চায়? যে নিজেকে পশু বানাতে চায় সে নিজেকে তাই বানাক। কিন্তু মানুষ আমরা যারা মানুষ থাকতে চাই_ আমাদের প্রাণ থাকতে কিছুতেই মনুষ্যত্বের ওপরে পশুত্বকে জয়ী হতে দেব না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>