তারিক ইসলাম শামীম

রাজধানীর মিরপুরের জঙ্গি আস্তানায় সাতজনের দগ্ধ লাশ পাওয়া গেছে। বুধবার বেলা সোয়া তিনটার পর এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ এ কথা জানান।ঘটনাস্থলের কাছে সংবাদ ব্রিফিংয়ে বেনজীর আহমেদ বলেন, আজ ভবনে সাতজনের কঙ্কাল হয়ে যাওয়া দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। কক্ষের মধ্যে এখন ৫৫ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রয়েছে। রাজধানীর মিরপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে ৭টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো জঙ্গি আবদুল্লাহ, তার দুই স্ত্রী, দুই সন্তান ও দুই সহযোগীর। তবে লাশগুলো এমনভাবে পুড়েছে যে কোনটা কার লাশ তা শনাক্ত করা যায়নি। পরে ডিনএনএ পরীক্ষা করে পরিচয় জানানো হবে।ঘটনাস্থলে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজিন আহমেদ এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাতে পঞ্চম তলায় বিস্ফোরণের পর ২/২ ফুট গর্ত হয়ে আগুন চার তলায় ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভবনটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ। চার তলা পর্যন্ত পরিষ্কার করা হয়েছে। পাঁচতলার তাপমাত্রা এখন অনেক বেশি। ৫০-৫৫ ডিগ্রি তাপমাত্র রয়েছে সেখানে। বেশিক্ষণ সেখানে থেকে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই পুরো পঞ্চম তলা পরিষ্কার করতে বেশ কয়েকদিন সময় লাগবে। সেখানে থাকা সব বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ হয়েছে।

র‌্যাবের ডিজি বলেন, ২০০৫ সালে জেএমবির সঙ্গে যুক্ত হয় জঙ্গি আবদুল্লাহ। ২০১৩ সালে তিনি নব্য জেএমবির সঙ্গে যুক্ত হয়। তার বাসায় জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়া হতো। এছাড়া তিনি জঙ্গিদের অর্থের যোগান দিয়েছে। ওই বাসায় সরোয়ার জাহান, তামিম চৌধুরীর যাতায়াত ছিল। সরোয়ার-তামিম গ্র“পের একজন শুরা সদস্য কারাগারে বন্দি আছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই আবদুল্লাহর নাম জানতে পেরেছিল র‌্যাব। বছর খানেক ধরেই তারা আবদুল্লাহকে খুঁজছিল। অবশেষে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচানো সম্ভব হলো। তার বাসায় যে পরিমাণ বিস্ফোরক ছিল তা দিয়ে বড় ধরেন নাশকতা চালানো সম্ভব হতো।র‌্যাবের ফরেনসিক টিমের একজন সদস্য বলেন, পঞ্চম তলার রুমের ফ্ল্যাটের তিন রুমে মৃতদেহগুলো ছড়ানো ছিটানো ছিল।এর আগে সকাল থেকে জঙ্গি আস্তানায় দ্বিতীয় দিনের অভিযান শুরু করে র‌্যাব।

বেনজীর আহমেদ বলেন, নিহতদের মধ্যে জঙ্গি আব্দুল্লাহ, তাঁর দুই স্ত্রী, দুই ছেলে এবং বাকি দুজন কর্মচারী বলে ধারণা করা হচ্ছে। আব্দুল্লাহ জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের আল-আনসার সদস্য ছিলেন। তিনি বলেন, জেএমবির এই অংশটির প্রধান সারোয়ার জাহান, কানাডীয় নাগরিক তামিম চৌধুরী, অংশটির আরেক নেতা সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজসহ অনেকেই আব্দুল্লাহর বাড়িতে ঘুমিয়েছেন। সারোয়ার-তামিম অংশটি ভেঙে যাওয়ার আগে পুরোনো অংশের এক শুরার সদস্য, তাঁর নাম আমি বলতে চাই না, তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর আব্দুল্লাহর বিষয়ে জানিয়েছিলেন। বেনজীর আহমেদ জানান, বিস্ফোরণ হওয়া বাড়িটিতে কবুতরের খামার ছিল। বিস্ফোরণে অনেকগুলো কবুতর মারা গেছে। তিনি বলেন, এখানে রাসায়নিক বিস্ফোরণ হয়েছে। এতে ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।গত সোমবার রাত ১১টার দিকে মিরপুর মাজার রোডের বর্ধনবাড়ি এলাকার ‘কমল প্রভা’ নামের বাড়িটি ঘেরাও করে র‌্যাব। বাড়ির পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাটে জঙ্গিদের অবস্থান র‌্যাব চিহ্নিত করে। পরে বাড়ির বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।এক প্রবাসীর মালিকানাধীন ছয়তলা বাড়িটির ২৪টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ২৩টি ফ্ল্যাটের ৬৫ জন বাসিন্দাকে সোমবার রাতেই সরিয়ে নেয় র‌্যাব।

জঙ্গি আস্তানাটি ঘিরে রাখার প্রায় ২৪ ঘণ্টার মাথায় মঙ্গলবার রাত পৌনে ১০টার দিকে বাড়িটিতে পরপর তিনটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয়। বাড়ি থেকে আগুন ও ধোঁয়ার কুন্ডলী বের হয়।বিস্ফোরণের পর র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলেন, বাড়ির ভেতরে থাকা জঙ্গিরা নিজেরা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন।এ ছাড়া দুপুর পৌনে ১২টার দিকে গুলির শব্দ পাওয়া যায়। আজ সকালে ওই ভবনে তল্লাশি শুরু করেন বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল, র‌্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।র‌্যাব-৪-এর সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল আউয়াল জানান, জঙ্গি আবদুল্লাহর গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়। তাঁর বাবা ইউসুফ আলী অনেক আগেই মারা গেছেন। ওই আস্তানায় আবদুল্লাহর সঙ্গে তাঁর দুই স্ত্রী ফাতেমা ও নাসরিন ছিলেন। ছিল দুই শিশু ওসামা ও ওমর। সঙ্গে আবদুল্লাহর দুই সহযোগীও ছিলেন। তিনি জানান, আবদুল্লাহর চুয়াডাঙ্গার বাড়ি থেকে তাঁর বোন মেহেরুন্নেসা মেরিনাকে আটক করে র‌্যাব হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।ও ওই আস্তানার আশপাশে কড়া অবস্থানে রয়েছে র‌্যাব। গাবতলীর দিক থেকে ওই এলাকায় যাওয়ার পথ বন্ধ রয়েছে।সকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ও র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ ওই এলাকা পরিদর্শন করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>