—সালাম সালেহ উদদীন–

রোহিঙ্গা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। রোহিঙ্গা নারী, শিশু, বৃদ্ধ, যুবক-যুবতী সবাই আজ চরমভাবে নির্যাতনের শিকার। তাদের জীবন আজ বিপন্ন, বিপন্ন মানবতা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হত্যা, নির্যাতন, বাড়িঘরে অগি্নসংযোগ ও লুটপাটসহ রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক তা-ব চালাচ্ছে। ফলে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীরা হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশই এখন তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। তাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই।
উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ও সেনা চৌকিতে হামলা হয়। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা রাখাইন রাজ্যের ৩০টি পুলিশ ফাঁড়িতে ও একটি সেনা ছাউনিতে বিদ্রোহীদের ওই হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ জনসহ ৩২ জনের প্রাণহানী ঘটে। এরপর থেকে সেনাবাহিনী অভিযানে নামে। সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ এবং বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। গত বছরের অক্টোবর এবং এ বছরের ২৪ আগস্টের সেনা অভিযানের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসেছে। আর এবার সংখ্যাটি আগেরবারের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে .

রোহিঙ্গা সংকট নতুন নয়। ১৯৭৭ সালে মিয়ানমার সরকারের অত্যাচারে ২ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। ওই সময়ে বাংলাদেশ সরকার ও মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে চুক্তি হয়। ওই চুক্তির ফলে বেশকিছু শরণার্থী দেশে ফিরে গিয়েছিল। এরপর ১৯৯২, ২০১২, ১৩ ও ১৪ সালে অনেক রোহিঙ্গা দেশ ছেড়েছে। আর এবার ১৯৭৭ সালের মতোই ঢল নেমেছে। এবারও প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে সর্বশেষ খবরে প্রকাশ।
প্রশ্ন হচ্ছে_ বাংলাদেশ কেন এই চাপ সহ্য করবে? কেবলই কি মানবিক কারণে? যে সব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে, তারা নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। যা দেশের জন্য নতুন এক আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। নতুন করে সীমান্তে রোহিঙ্গাদের ঢল নামাতে এই আপদ যে আরও বৃদ্ধি পাবে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। নির্বিচারে হত্যা ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়ায় প্রাণে বাঁচতে রোহিঙ্গারা যেভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে, তাতে এ দেশের পক্ষে সামাল দেয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। দুই সপ্তাহ ধরে আসা রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়ছে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার বিভিন্ন গ্রামে।
এর মধ্যে অবশ্য বিশ্বের ১৩ জন নোবেল বিজয়ী বিবৃতি দিয়েছেন। তারা বলেছেন এটা মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। বিশ্ববিবেক যদি এ ব্যাপারে সোচ্চার না হয় তা হলে মিয়ানমার সরকার এই ধরনের নিষ্ঠুর নির্যাতন বন্ধ করবে না। বন্ধ হবে না বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশও। ইতোমধ্যে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী সু চির নিন্দা করছে বিশ্ববাসী। বৈদেশিক শক্তির হাতের পুতুল সু চি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কী কাজ করেছেন, এই প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুর্দশা নিয়ে ‘ ভুয়া সংবাদ’ ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এটা যে কী ভয়ঙ্কর মানবতাবিরোধী মন্তব্য তা বলে শেষ করা যাবে না। শান্তিতে নোবেল পদকপ্রাপ্ত নেত্রী আজ নিজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করে বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হচ্ছেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তার নোবেল পদক বাতিল করারও দাবি উঠেছে। তার অতীতের ত্যাগ ও গৌরব ধুলোয় মিলিয়ে গেছে। তিনি যে ক্ষমতার কাছে সমর্পিত শেষ পর্যন্ত এটাই প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হলো। মিয়ানমারের টার্গেট হচ্ছে রোহিঙ্গাশূন্য রাখাইন। দেশটি সে দিকেই ধাবিত হচ্ছে। এর ফল যে ভবিষ্যতে ভালো হবে না, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
তারপরেও বলবো, রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে মিয়ানমারকেই এগিয়ে আসতে হবে। নাগরিকত্ব না পাওয়ায় এবং নিদারুণ বৈষম্যের শিকার মুসলমান রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে। তাদের ওপর বল প্রয়োগের পথ ছেড়ে মিয়ানমার সরকারকে যৌক্তিক সমাধানের পথে আসাটা জরুরি। তিন দশক ধরে ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। অন্যদিকে রাখাইন জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখেছে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে দেশটি। এমন কি সেখানকার সেনাবাহিনী সীমান্তে ল্যান্ড মাইন পেতে রেখেছে। বিষয়টি খুবই আতঙ্কের।
বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে প্রতিবেশীসুলভ মনোভাবের পরিচয় দিয়ে আসছে বার বার। কিন্তু প্রয়োজন এর স্থায়ী সমাধান। এ ঘটনা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত উদ্বেগের। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন হলে তারা বাংলাদেশে ছুটে আসে, আর মানবিক কারণে বাংলাদেশও তাদের আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে_ কয়েক লাখ রোহিঙ্গার ভার বহন করবে কেন বাংলাদেশ। যত দ্রুত সম্ভব সৃষ্ট পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান জরুরি। অসহায় রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পোড়ানোর তা-বে ব্যস্ত মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছে, রক্ত আর পোড়ানোর নেশায় মরিয়া মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একদল উন্মত্ত তরুণ। তারা সেনা-পুলিশের উপস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের খুন করছে! গত চারদিনে টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ৩৩টির বেশি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে। হুড়োহুড়ি করে নাফ নদী পারাপার করতে গিয়ে গত চার দিনে রোহিঙ্গাবোঝাই ছয়টি নৌকা ডুবে গেছে। গত সোমবার সকাল পর্যন্ত ৫৭ রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে আসে এমন নির্মম পরিস্থিতির শেষ কোথায়? মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এত বড় নিষ্ঠুরতার ঘটনা ঘটাচ্ছে, অথচ আন্তর্জাতিক অঙ্গনও ততটা সোচ্চার হয়নি, প্রতিবাদও তেমন জোরালো নয়।
বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারীদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। কারও কোলে শিশু, কারও মাথায় বোঝাই করা শেষ সহায়-সম্বল, কেউবা সঙ্গে নিয়ে এসেছেন গরুসহ বিভিন্ন গবাদি পশু। কী অমানবিক দৃশ্য। এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা সমস্যায় পড়লেই আমরা তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করি। কিন্তু বার বার তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা কি সম্ভব?’ তার কথার মধ্যে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ, ওআইসি, বিভিন্ন মুসলিম দেশসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামের সঙ্গেও ব্যাপক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া দরকার। বাংলাদেশ একটি জনসংখ্যাবহুল দেশ, এছাড়া প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ভরণ-পোষণের ভার বহন করছে। এটা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি চাপ। কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে কোনো অগ্রগতি নেই বললেই চলে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে, সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে, যেন দ্রুত স্থায়ী সমাধানের দিকে যাওয়া যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম দেশগুলো থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেটনো মারসুডি মিয়ানমার সফর করেছেন, এবং তিনি সে দেশের সামরিক বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে দেখা করে এ সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি মুসলিম দেশ মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে দেশটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে এ আহ্বান জানিয়ে এই সংকটের দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানানো হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দ্রুত জাতিসংঘেরও হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তার আহ্বান অত্যন্ত সময়োপযোগী। এরই মধ্যে মিয়ানমারের উপ-রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দেশটির সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে মালদ্বীপ। মালদ্বীপের মতো আন্তর্জাতিক বিশ্ব যদি সোচ্চার হয় তবে মিয়ানমার সরকারের টনক নড়বে।
মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গারা এখন বড় অসহায়। তারা নির্যাতিত-নিষ্পেষিত। তারা এখন ঘর ছাড়া, দেশ ছাড়া। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুরবস্থা দেখে যে কোনো মানবিক লোকের হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে যাবে, অশ্রুপাত করবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ তার নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বের মানুষের রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত, সৃষ্টি করা উচিত আন্তর্জাতিক চাপ। কারণ মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য। এই দর্শন বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। এর ব্যত্যয় ঘটলে বিপন্ন মানবতার কান্নাই কেবল আমরা শুনবো কোনো রকম প্রতিকারহীনভাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>