—গোলাম মোর্তোজা—

বাংলাদেশের মানুষের বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হচ্ছি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা জঙ্গি!
বিত্তবানদের সন্তানরা জঙ্গি হচ্ছে!!
গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি আক্রমণ, হত্যাযজ্ঞের পর দেশের মানুষের বড় একটি অংশকে এভাবে বিস্মিত হতে দেখছি। যেন তারা এই প্রথম জানলেন যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গি আছে। ট্রিপিক্যাল মধ্যবিত্ত মানসিকতা নিয়ে এতদিন তারা বসেছিলেন, জঙ্গি মানে ক্ষুধা-দারিদ্র্যে ভোগা নিম্নবিত্তের সন্তানেরা। এই জঙ্গিরা হত্যা করছে অনলাইন লেখক-প্রকাশকদের। যাদের পরিচিতি দেয়া হয়েছে ‘নাস্তিক’। এখন যারা বিস্মিত হচ্ছেন, তাদের একটা অংশ এসব হত্যাকাণ্ড মৌনভাবে সমর্থন করেছেন। তারপর যখন মাওলানা-মুয়াজ্জিন-পাদ্রী-পুরোহিত হত্যাকাণ্ড শুরু হলো, তখনও তারা মৌন সমর্থনই করে গেছেন। সমর্থন না করলেও চুপচাপ থেকেছেন এই ভেবে যে, ‘আমি তো নিরাপদ’।
রাজনীতিবিদ-আমলা-ব্যবসায়ীরা খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না এসব হত্যাকাণ্ডে। নিজেরা ‘নিরাপদ’ অঞ্চলে বসবাস করেন। নিরাপত্তার জন্যে সঙ্গে পুলিশ রাখেন। যারা পুলিশের ব্যবস্থা করতে পারেন না, তারা অস্ত্রধারী নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে চলেন। হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হত্যাযজ্ঞের পর সবচেয়ে বেশি ‘ভয়’ পেয়েছেন, এই উচ্চবিত্ত শ্রেণি। এই প্রথম তারা ভাবতে শুরু করেছেন যে, তারা ‘নিরাপদ’ নন। এতদিন যারা চিৎকার করে বলতেন, এমন ঘটনা পৃথিবীর সব দেশেই ঘটে। তাদেরও গলার স্বর কিছুটা নরম হয়েছে।
গুলশান হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট আক্রান্ত হওয়ার পর একটা নতুন উপলব্ধি হয়েছে যে, মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত সবাই ভাবছেন তারা কেউ নিরাপদ নন।

২.
এবার আসি মানুষের বিস্মিত হওয়া প্রসঙ্গে। যারা এতদিন আক্রমণের শিকার হননি, নিজেদের নিরাপদ ভাবছিলেন আর বুদ্ধি দিচ্ছিলেন ‘যারা লেখালেখি করছেন তাদেরও সতর্ক হওয়া দরকার’। আমাদেরকে বলছিলেন, ‘কী দরকার এসব কথা বলার, লেখার। দেশের উন্নয়ন তো হচ্ছে’। তথাকথিত উন্নয়ন কোনো কাজে আসে না যদি মানুষের জীবন নিরাপদ না হয়- এ কথাকে গুরুত্বের মধ্যেই আনতে চাননি। জঙ্গিবাদের গভীরতা যে কত ব্যাপক, অনুধাবনই করতে চাননি। জানতে চাননি, বুঝতে চাননি।
আমরা জানিয়েছি বারবার। সতর্ক করার চেষ্টা করেছি।
সুনির্দিষ্ট করে বলেছি, মাদ্রাসার জঙ্গিদের চেয়ে ভয়ঙ্কর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জঙ্গি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে হিযবুত তাহরীর জঙ্গি গড়ে তুলছে। ২০০৭ সাল থেকে একথা বলছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর হিযবুত তাহরীরের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেছে। হিযবুত তাহরীরের জঙ্গিবাদ নিয়ে লিখেছি, বলেছি। প্রথমাবস্থায় গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
২০০৯ সালের ২ এপ্রিল ‘সাপ্তাহিক’-এ প্রচ্ছদ করেছিলাম, ‘হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে আল কায়েদার জঙ্গি নেটওয়ার্ক’ নিয়ে। আল কায়েদাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে হিযবুত তাহরীরের যোগাযোগ আছে, তথ্যপ্রমাণ দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি। প্রশাসনের একটি অংশ এটাকে ভালোভাবে নেয়নি। আরেকটি অংশ এটিকে ইতিবাচকভাবে নেয়। ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর জঙ্গি সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে হিযবুত তাহরীরকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়। সংগঠন নিষিদ্ধ করার পরও হিযবুত তাহরীরের নেতারা প্রকাশ্যে অবস্থান করতে থাকে। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দিতে থাকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের নেতারা। ২৯ অক্টোবর ২০০৯ সালে ‘সাপ্তাহিক’-এ আবার প্রচ্ছদ করা হয় ‘নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীর : নেতারা নয়!’
বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর প্রধান চার নেতা মহিউদ্দিন আহমদ, ড. সৈয়দ গোলাম মাওলা, কাজী মোরশেদুল হক ও ড. শেখ তৌফিক। এরা চার খলিফা হিসেবে পরিচিত ছিল। হিযবুত তাহরীরের প্রধান সমন্বয়কারী মুখপাত্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র সহযোগী অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমদ। অধ্যাপক গোলাম মাওলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক। খোলাফায়ে রাশেদিনের মধ্যে প্রধান খলিফা গোলাম মাওলা। হিযবুত তাহরীরের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলে তার নেতৃত্বে। মহিউদ্দিন আহমদ মূলত একজন বক্তা। ড. শেখ তৌফিক নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সে দেখত আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও আর্থিক বিষয়। নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় যে জঙ্গিদের কারখানায় পরিণত হয়েছে, তার পেছনে শুরুর থেকে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে শেখ তৌফিক।
সংগঠন নিষিদ্ধ করার কিছুদিন পর গোলাম মাওলাকে তার বাড়িতে আটকে রাখা হয়। এছাড়া অন্য কোনো নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বেতন-ভাতাসহ সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে।

৩.
জঙ্গি সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও হিযবুত তাহরীর কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে তাদের মিছিল করতে দেখা যায়। এসব মিছিল থেকে অনেক হিযবুত জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করা হয়। মজার বিষয় হলো, জঙ্গি হিসেবে গ্রেপ্তার করে মামলা করা হয় সাধারণ আইনে। ফলে জঙ্গিরা খুব সহজে জামিন নিয়ে বের হয়ে যায়। কয়েকটি নমুনাÑ
২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় হিযবুত জঙ্গি নূর আলম (২৭), আমজাদ হোসেন (৩২), মাহমুদুল আলম (১৮)-কে।
২০১৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ৭ জন হিযবুত তাহরীর জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকার খিলক্ষেত থেকে। এরা নর্থ-সাউথ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটের শিক্ষার্থী।
১ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে হিযবুত তাহরীরের বেশ কয়েকজন মহিলা জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরাও বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই এরা সবাই জামিন নিয়ে বেরিয়ে যায়।
আরও মজার বিষয় এই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনটি ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঘোষণা দিয়ে অনলাইন সম্মেলন করে। ঘোষণা দিয়ে এই অনলাইন সম্মেলনটি তারা করে নির্বিঘেœ। একটি জঙ্গি সংগঠন, যাদের কোনো বৈধতা নেই, রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ হয়ে অনলাইনে সম্মেলন করেছে। অথচ তাদের বাধা দেয়া হয়নি। কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

‘সাপ্তাহিক’-এর ৮ সেপ্টেম্বর ২০১১ সালের সংখ্যায় ‘হিযবুত তাহরীর : নিষিদ্ধ জঙ্গি জামিনে মুক্ত’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট করেন সাংবাদিক আনিস রায়হান। সেই রিপোর্টের কিছু অংশ :

ধরে রাখা যাচ্ছে না তাদের
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯ আগস্ট, ২০০৯ পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় লিফলেট বিলির সময় গ্রেপ্তার হিযবুত তাহরীর এর তিন সদস্যকে জামিন দিয়েছে আদালত। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ এএনএম বশির উল্লাহ আলাদা দুটি মামলায় তাদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকার মুচলেকায় জামিন দেন। জামিনপ্রাপ্তরা হলেন নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাহরিয়ার মোস্তফা ও রায়হান তাহের এবং উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ ছাত্র আহম্মেদ সাঈদ আরেফিন।
পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, বিগত ২০১০ সালে শুধু সিলেট নগরীতে প্রচারপত্র বিলি, পোস্টার লাগানো ও গোপন সভা করার সময় ১১ হিযবুত তাহরীর জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে গত বছরের ৫ ফেব্র“য়ারি গ্রেপ্তার করা হয় সিলেট নগরীর ১৫ ফাজিলচিস্তের সফি আহম্মেদ চৌধুরীর ছেলে ফরহাদ সফি চৌধুরী, আখালিয়া বিডিআর গেটের বিপরীতে শহীদ মিয়ার বাসার ভাড়াটে কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট থানার নিশ্চিন্তপুরের আবদুল মান্নানের ছেলে মাহফুজুর রহমান, জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী থানার সিমলাবাজারের খন্দকার সফিকুর রহমানের ছেলে মুশফিকুর রহমান ও সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ থানার কাশিমপুরের রেজাউল ইসলামের ছেলে আশরাফ উজ্জামানকে।
এ ছাড়া গত বছরের ১৬ আগস্ট সিলেটের বিয়ানীবাজার থানার খাড়াভরা গ্রামের মৃত গোলাম হোসেন চৌধুরীর ছেলে জুম্মান হোসেন চৌধুরী, সিলেট নগরীর আম্বরখানার ওয়েভস ১১৩ নম্বর বাসার মমতাজ হোসেন শিবলীর ছেলে মেহেদী হাসান অমি, একই বছরের ২৮ অক্টোবর বিশ্বনাথ থানার হরিপুর গ্রামের আজিজুল মান্নানের ছেলে রিদোয়ান হোসাইন সুমন, কানাইঘাটের ধনমাইর মাটি গ্রামের আবদুল মজিদের ছেলে জুনেদ আহম্মদ চৌধুরী সানি, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার নোয়াপাড়া শ্রীনগর গ্রামের মৃত জহির আলীর ছেলে আবদুল্লা আল মুনাফ, ৮ সেপ্টেম্বর কানাইঘাটের পারকুল গ্রামের হাজির আলীর ছেলে আলী আহম্মদ ও চলতি বছরের ২ জানুয়ারি দক্ষিণ সুরমার সিলাম টিলাপাড়ার মো. সাইফুল হোসেনের ছেলে মেহেদী হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিগত বছরজুড়ে হিযবুত তাহরীরের এই ১১ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখন তারা আদালত থেকে জামিনে রয়েছে। সিলেট ও ঢাকা বর্তমানে হিযবুত তাহরীরের রণনৈতিক অঞ্চল। উভয় এলাকাতেই গ্রেপ্তারের কিছুদিন পরই জেল থেকে বেরিয়ে আসছেন এই নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। জেল থেকে বেরিয়ে এসে তারা এলাকা পাল্টে আবার ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে।

দুর্বল মামলা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হিযবুত তাহরীরের কোনো কর্মী আটক হলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ এর ৮, ৯, ১২ ও ১৩ ধারায় মামলা করে। অনেকের প্রশ্ন এই ধারাগুলোয় মামলা করাটা যথেষ্ট কিনা। যথেষ্ট যে নয়, তা বেরিয়ে এসেছে স্বয়ং ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্রের বক্তব্যেই। মনিরুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যেই হিযবুত তাহরীরের আটক কিছু নেতাকর্মী জামিনে ছাড়া পেয়েছে। তারাই মূলত দলকে সংগঠিত করছে। তারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে খবর রয়েছে। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে যে মামলা করা হচ্ছে তা যথার্থ নয়।

আইনে যা বলা হয়েছে
সন্ত্রাসবিরোধী আইন হিযবুত তাহরীরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, অনেক আইন বিশেষজ্ঞ এমন মতামত দিয়েছেন। এই আইনের ৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হন বা সদস্য বলে দাবি করেন, তাহলে তিনি অপরাধ সংঘটন করবেন এবং ওই অপরাধ সংঘটনের জন্য তিনি অনধিক ছয় মাস পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
এর ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনকে সমর্থন করার উদ্দেশ্যে কাউকে অনুরোধ বা আহ্বান করেন, অথবা নিষিদ্ধ সংগঠনকে সমর্থন বা তার কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোনো সভা আয়োজন, পরিচালনা বা পরিচালনায় সহায়তা করেন, অথবা বক্তৃতা প্রদান করেন, অথবা রেডিও, টেলিভিশন অথবা কোনো মুদ্রণ বা ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে কোনো তথ্য সম্প্রচার করেন তাহলে তিনি অপরাধ সংঘটন করবেন। এ ধরনের অপরাধের জন্য তিনি অনধিক সাত বছর ও অন্যূন দুই বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডও আরোপ করা যাবে।
এর ১২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য কোনো অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেন, তাহলে তিনি উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
এই আইনের ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্বেচ্ছাধীন কর্মকাণ্ড অথবা অংশগ্রহণের মাধ্যমে কোনো দলিল প্রস্তুত বা বিতরণ করেন, অথবা কোনো মুদ্রণ বা ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে কোনো তথ্য সম্প্রচার করেন, অথবা কোনো সরঞ্জাম, সহায়তা বা প্রযুক্তি বা প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে নিজে এমনটা জানা সত্ত্বেও সহায়তা প্রদান করেন যে, উক্ত দলিল, সরঞ্জাম, সহায়তা বা প্রযুক্তি বা প্রশিক্ষণ এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনের কাজে ব্যবহৃত হবে বা উক্ত ব্যক্তি বা সংগঠন এগুলো একই ধরনের অপরাধ সংঘটনের প্রচেষ্টায় ব্যবহার করবে, তাহলে তিনি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্ররোচিত করেছেন বলে গণ্য হবেন। সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তির দুই-তৃতীয়াংশ মেয়াদের কারাদণ্ডে, অথবা অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে তাকে দণ্ডিত করা যাবে। এবং যদি উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হয় তাহলে অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ড হবে। কিন্তু তা পাঁচ বছরের কম হবে না।

আইনে লঘু সাজা
এই চারটি ধারার মধ্যে ১২ নম্বর ধারাটি অপরাধ প্রমাণের বা নির্ণয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ১৩ নম্বর ধারাটি প্রমাণ করা সময় ও সুযোগ সাপেক্ষ। তাই হিযবুত তাহরীর কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রধানত ৮ ও ৯ নম্বর ধারাতেই বিচার হওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু ৮ ও ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হলেও সর্বোচ্চ সাজা হবে ছয় মাস বা দুই বছর। ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী সভা আহ্বান ও বক্তব্য দেয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ ধরনের কাজগুলো করে নেতৃস্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা। এদের জন্য সাজা নির্দিষ্ট করা হয়েছে মাত্র দুই বছর। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের নেতার সাজা যদি হয় সর্বোচ্চ দুই বছর তাহলে দেশের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, বিষয়টা ভাবনার দাবি রাখে।
এ প্রসঙ্গে বিচারপতি গোলাম রাব্বানি বলেন, যখন এই আইনটি করা হয় তখন সাংসদরা ধারণা করেননি যে, এ ধরনের অপরাধ এত বেশি ঘটবে। তারা ভাবেননি যে, এগুলো রাষ্ট্রদ্রোহিতার দিকে মোড় নেবে। আমার মনে হয়, নিষিদ্ধ সংগঠন করার সাজা ছয় মাস, এটা খুবই লঘু সাজা। নিষিদ্ধ সংগঠনের হয়ে সভা পরিচালনার সাজা সাত মাস থেকে দুই বছর, এটাও খুব কম। আমি দাবি করব, এই সাত মাসের সাজাকে বাড়িয়ে অন্তত সাত বছর করা হোক। তা না হলে এ ধরনের অল্প সাজা দেয়া হলে এই অপরাধীরা আরও মারাত্মক হয়ে উঠবে। বাড়বে অপরাধ প্রবণতা।

নেই রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ
নিষিদ্ধ সংগঠন করা সত্ত্বেও হিযবুত তাহরীর কর্মীদের বিরুদ্ধে দেয়া হচ্ছে না রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। সাধারণত রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যবিধির ১২০ (খ), ১২১ ও ১২১ (ক) ধারায় মামলা করা হয়। কিন্তু এসব ধারার কোনোটিই দেয়া হচ্ছে না হিযবুত তাহরীর কর্মীদের মামলায়। তাই খুব সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে তারা। এ যেন গুরুপাপে লঘুদণ্ড।

৪.
গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে এবং শোলাকিয়ার ঈদের জামাতের কাছে আক্রমণের মধ্য দিয়ে হিযবুত তাহরীরের তৈরি করা জঙ্গিদের ভয়াবহ এবং আন্তর্জাতিক কানেকশনের বিষয়টি বড়ভাবে সামনে এসেছে। দেশের মানুষ বিচলিত হয়েছে।
প্রশ্ন হলো প্রশাসন কতটা বিচলিত হলো? তাদের কার্যক্রম বা মানসিকতায় পরিবর্তন আসল কিনা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়, তবে কিছু প্রশ্নের উত্তর পেতে হবে। এই উত্তরগুলো দিতে হবে প্রশাসনকেই।
ক. প্রথমাবস্থায় বলা হয়েছিল অভিযানে ছয় জঙ্গি নিহত হয়েছে। একজন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে জীবিত ধরা হয়েছে। ছবি প্রকাশ করা হয়েছে নিহত ৫ জঙ্গির। আরেকজনের ছবি প্রকাশ না করার কারণ কী? জীবিত জঙ্গির বিষয়ে আর কোনো তথ্য নেই কেন?
খ. হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গিরা আক্রমণ করেছে ১ জুলাই। ২ জুলাই নিহত জঙ্গি পাঁচজনের ছবি প্রকাশ করে নাম বলা হয়েছে, আকাশ, বিকাশ, ডন, বাঁধন ও রিপন। ৪ জুলাই গুলশান থানার এসআই বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় নিহত জঙ্গিদের নাম লেখা হয়েছে মীর সালেহ মোবাশ্বের (১৯), রোহান ইমতিয়াজ (২০), নিরবাস ইসলাম (২০), মো. খায়রুল ইসলাম পায়েল (২০), মো. শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ (২৬) ও সাইফুল চৌকিদার।
পুলিশ আগে কী নাম বলল, আর কী নামে মামলা করল? পুলিশ কিন্তু এখনও বলেনি যে, তারা আগে ভুল নাম প্রকাশ করেছিল। ভুল স্বীকার করে সংশোধিত হয়ে নিলে ঠিক আছে। তা যদি না হয়, এক নাম প্রচার করে আরেক নামে মামলা, প্রশ্ন উঠবে না?
গ. গুলশান পুরো এলাকাটি সিসি ক্যামেরার আওতায়। জঙ্গি কোন দিক দিয়ে এসেছে, রেস্টুরেন্টে ঢুকেছে, সবই ক্যামেরায় ধরা পড়ার কথা। রেস্টুরেন্টের সামনে একটি কালো প্রাডো জিপ দাঁড়ানো ছিল বলে যা বলা হচ্ছে, সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজেও তা থাকার কথা। জিপটি কখন রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে চলে গেল, তাও দেখা যাওয়ার কথা। তদন্তের স্বার্থে এখনই না হলেও, প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে হবে।
ঘ. ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ডিজিএফআই বিল্ডিংয়ের সামনে আক্রমণের পর একজন জঙ্গিকে ধরা হয়েছিল। সেই জঙ্গিকে পরবর্তীতে কী করা হলো? তার থেকে কী তথ্য জানা গেল? সে সম্পর্কে আর কোনো কিছু জানা গেল না কেন?
ঙ. চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর একটি মসজিদের ভেতরে বোমা হামলার সংবাদ জানা গিয়েছিল। ঘটনাটি আসলে কী ছিল? সেই হামলায় কারা জড়িত ছিল? তদন্তে কী জানা গেছে?

৫.
পাকিস্তানে জঙ্গি নিয়ে খেলাধুলা করত গোয়েন্দা সংস্থা আইএফআই। রাজনীতিবিদরাও সুবিধামতো জঙ্গিদের ব্যবহার করত গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। তারপর সেই জঙ্গিরা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে পাকিস্তানের জন্যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবে পরিণত হওয়ার ইতিহাস তো সবারই জানা। বাংলাদেশে জঙ্গি বিশেষ করে হিযবুত তাহরীরকে নিয়ে খেলাধুলার আকার-ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কে বা কারা এই খেলাধুলা করে? যারা খেলাধুলা করে, এই জঙ্গিরা এখন যে আর তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তা তো স্পষ্ট।
এখন করণীয় কী? অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে কি পরিত্রাণ মিলবে? মিলবে না। আমেরিকা-ইউরোপ-ভারত কোনো বিদেশি রাষ্ট্রও এই সমস্যার সমাধান করে দিয়ে যেতে পারবে না। দায় অন্যের উপর চাপিয়েও সমাধান মিলবে না।
‘এসব সংগঠনের পক্ষ থেকে এতদিন নিখোঁজ ব্যক্তিদের গুম করা হয়েছে বলে তুলে ধরে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এরা নিজেরাই জঙ্গিদের দলে যোগ দিয়েছে। এসব সংগঠন যদি তখনই এ বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারত, তাহলে সংকট এতটা ঘনীভূত হতো না।’
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের তাৎপর্য ভয়ঙ্কর। এর মধ্য দিয়ে সব ‘গুম’ এক ধরনের বৈধতা পেয়ে যায়।
কে জঙ্গিদের দলে যোগ দিয়েছে, কাকে গুম করা হয়েছে- রাষ্ট্রপ্রধান এই তথ্যের জন্যে মানবাধিকার সংগঠনের উপর নির্ভর করেন? তিনি ‘তথ্য’ মানবাধিকার সংগঠনের থেকে পেয়ে থাকেন?
সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী তাহলে কী করেন? ‘তথ্য’ তাদের থেকে পান না? কোনো ‘গুম’ বা ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ঘটনা কেন রাষ্ট্রীয় বাহিনী তদন্ত করে বের করতে পারল না? ‘গুম’ হওয়ার পর যারা ফিরে এলেন, তাদের কারা গুম করেছিলÑ সেই তথ্যও জানা গেল না কেন?
আর মানবাধিকার সংগঠন বললেই আপনারা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেন? মানবাধিকার সংগঠনের কাজের প্রতি এত আস্থা? তারা তো অনেক কথা বলেন, ব্যবস্থা নেয়া হয় কোনো ক্ষেত্রে?
‘এটা ইসলামের পথ নয়, তারা কেমন মুসলিম, এটা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ…’Ñ সবার ইসলাম বিশেষজ্ঞও হওয়ার দরকার নেই।
‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১০ দিন অনুপস্থিত থাকলেই জানাতে হবে’ ‘বাবা সোনারা ফিরে এসো’Ñ জঙ্গিবাদ এখন আর এত ছোট জায়গাতে নেই। এগুলো খুব ইমম্যাচিউরড কথা-কাজ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তার পরিচয় পরিষ্কার করা দরকার! ধর্মনিরপেক্ষতা, রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম- একসঙ্গে চলতে পারে না। গোঁজামিল দিয়ে চললে, সমস্যা-জটিলতা-বিভ্রান্তি বাড়ে। ফতোয়ার বিরুদ্ধে এত যুদ্ধ করে, নিজেরাই ফতোয়ার আয়োজন করছেন? এরপর যখন আপনার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়া হবে, তখন কী করবেন? স্ববিরোধিতায় জটিলভাবে আটকে যাচ্ছেন।
সমস্যা নিজেদের। নিজেরা তৈরি করেছি। এখন প্রথমে সমস্যা স্বীকার করতে হবে। তারপর ভাবতে হবে ব্যবস্থা নেয়ার কথা। যুদ্ধাপরাধের বিচার করে প্রশংসিত হচ্ছেন, দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করার দায় নিশ্চয় নিতে চান না? তা না চাইলে, সব রাজনৈতিক দল (বিএনপি, বাম দলগুলোকে নিয়ে, জামায়াত ছাড়া) নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনুন। ধ্বংস করে দেয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মেরামতের উদ্যোগ নিন। বিরোধী রাজনীতি দমন এবং একগুয়েমি মানসিকতা পরিত্যাগ করুন। ক্রসফায়ারের নামে জঙ্গি এবং হত্যাকারীদের হত্যা করে সত্য চাপা দেয়ার নীতি থেকে সরে আসুন। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন করুন।
‘যা যা করার সব করব’- এই কথায় সমাধান আসবে না। আপনি সব ‘তথ্য’ জানেন, আপনাকে সব তথ্য জানানো হচ্ছে- ঠিক আছে। ‘তথ্য’গুলো কতটা সঠিক তা নিয়ে আপনার নিজেরই প্রশ্ন করার সময় এসেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর প্রকাশ্যে অনলাইন সম্মেলন করে বলছে, ‘জালিম হাসিনা সরকারকে উৎখাত করতে হবে’। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেন?
প্রশ্নটি আমরা করছি। আপনারও কি করা উচিত নয়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>