—Hasan Mahmud Tipu—(Toronto, Ontario)–

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার জন্য সরকারী নির্দেশনা আসছে এরকম একটা খবর দেখলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা দিতে হবে এই ব্যপার সরকারী আমলাদের মাথায় কে ঢুকালো? এটা কি সেই আমলা আর শিক্ষকদের ইগো সমস্যা থেকে আহুত কীনা ভেবে দেখা দরকার! যাইহোক, সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় লিখিত পরীক্ষার নিয়ম করলে রাজনৈতিক নিয়োগ ভয়ংকর রকম বেড়ে যাবে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সেকেন্ড ক্লাস আপ্লাই করতে পারার নিয়ম রেখে লিখিত পরীক্ষা দিয়ে এমন কাউকে নিয়োগ দেয়া হবে যার কোন যোগ্যতাই নাই। প্রথম হওয়া স্টুডেন্ট শিক্ষক হতে পারবেনা। এতে করে কি হবে? পড়াশুনায় মন না দিয়ে শুধু শিক্ষক হওয়ার জন্য সিনিয়র এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক শিক্ষকদের পিছনে সময় ব্যয় করবে। এটা ভালো হবে?

একজন শিক্ষকের কাজ গবেষণা করা এবং ছাত্র-ছাত্রি পড়ানো। নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখতে হবে সে পড়াতে পারে কীনা, তার গবেষণার মান কিরকম! পশ্চিমা দেশে একজন শিক্ষক নিয়োগের জন্য কাউকে চার থেকে পাঁচটা ধাপ পার হতে হয়। প্রথমে প্রার্থীকে তার গবেষণার স্যাম্পল লেখা জমা দিতে হয় আবেদনের সময়, সেটা খুব ভালমতো স্ক্রুটিনি করে তাকে ইন্টার্ভিউতে ডাকা হয়। সেখানেই বোঝা যায় সে যোগ্য কীনা। ৫০টা আবেদন জমা পড়লে ৩-৪ জনকে ইন্টারভিউতে ডাকা হয়। প্রথমে ইন্টারভিউ হয় নিয়োগ কমিটির সাথে, তারপর হল ভর্তি ছাত্রছাত্রীর সামনে তাকে লেকচার দিতে হয় কমিটি থেকে ঠিক করে দেওয়া একটা বিষয়ে। সেই বিষয়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লেকচার দেয়ার পর ছাত্রদের কমিটি এবং শিক্ষকদের কমিটি থেকে ভোট নেওয়া হয়। তারপর তাকে আরেক ধাপ ইন্টারভিউ নেয় ডীনস কমিটি। একজন শিক্ষক নিয়োগের জন্য এসব ধাপ মেনে চললেই যথেষ্ট। ভালো শিক্ষক পাওয়া যাবেনা?

আমাদের বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়াও ফল্টি। নিয়োগের জন্য যে ইন্টারভিউ নেওয়া হয় তা মুখ দেখানো মাত্র। যে প্রথম হচ্ছে বা ফার্স্ট ক্লাস পাচ্ছে তাকেই নিয়োগ দেয়া হবে এটা নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে, যাচাই করা হচ্ছেনা সে গবেষণায় কতটুকু ভালো বা শিক্ষকতার যোগ্যতা আদৌ আছে কীনা। আর এই কারণে ক্লাসে প্রথম হওয়ার জন্য বিভিন্ন অসুদোপায় অবলম্বন হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে। কয়েকদিন আগে ঢাবি আইন বিভাগের হাবিবের কথা বলছিলাম। সে তার নিজের স্ত্রীকে প্রথম বানানোর জন্য টেবুলেশন শিটে জালিয়াতি করে ধরা পড়েছিল গতবছর। এরকম উদাহরণ ভুরি ভুরি দেয়া যাবে যে শিক্ষার্থি ভালো ফল করার জন্য শিক্ষকদের কাঁচা বাজার পর্যন্ত করে দিয়েছে।

আমরা যতই চিৎকার চেঁচামেচি করিনা কেন বাংলাদেশে শিক্ষার মান আসলেই অনেক খারাপ। শিক্ষকরা বিদেশ থেকে গবেষণা করে দেশে ফিরে তাঁদের যাবতীয় গবেষণা স্কিল এয়ারপোর্টে ফেলে দেশে ঢুকে। তারপর শুরু করে হয় রাজনীতি নয় গলাবাজী। প্রকৃত গবেষণা (গবেষণার ফিলসফি কি এটাই আমাদের অনেক গবেষক জানেন না। অনেক বড় বড় গবেষক শুধুমাত্র টাকার জন্যই গবেষণা করছেন।) একটা দেশের চালিকাশক্তি হতে পারে। তা নাহলে ইউরোপ আমেরিকা, জাপানে বাজেটের বিশাল অংশ গবেষণায় দিতনা।

আমি একটা ফেলোশিপ/স্কলারশিপ পাই একটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান থেকে, যারা আবার সরকার থেকেও বিশাল অংকের টাকা পায় গবেষণার জন্য। আমার মত এরকম আরো বিশজন আছে। এই আমিসহ প্রত্যেকে ক্যানাডার ভালো ভালো ল’ স্কুলে এলএলএম বা পিএইচডি করছে। এই ফেলোশিপটা ওরা আমাদের দিচ্ছে আমরা যাতে নির্বিগ্নে গবেষণা করতে পারি। এই প্রতিষ্ঠানের লাভ হল আমি যে বিষয় নিয়ে গবেষণা করছি সেটা জানা, কি মেথড ব্যবহার করছি সেটা জানা। এরা একটা থিংকট্যাংক হিসেবে কাজ করে। সরকারী (ফেডারেল এবং প্রভিন্সিয়াল) বেশ কিছু স্কলারশিপ আছে যা গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট এবং শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ। আমি প্রভিন্সিয়াল স্কলারশিপটাও পাই। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় বেশিরভাগ শিক্ষক কোন না কোন সময় ১ থেকে ৩ বছর মেয়াদি ৫ লাখ ডলারের ফান্ড পেয়েছে শুধু গবেষণার জন্য। আর বাংলাদেশে?? কল্পনা করাও যাবেনা। আমার এক শিক্ষক বন্ধু একটা গবেষণার জন্য ১০ হাজার টাকা স্কলারশিপ হিসেবে পেয়েছিলো ইউজিসি থেকে। সেই টাকা তোলার জন্য তার জীবন বের হয়ে যাচ্ছিলো। যতদিন না সরকার শিক্ষাখাতে এবং গবেষণার জন্য আর্থিক বরাদ্দ না বাড়াবে ততদিন উচ্চশিক্ষার মানবাড়বেনা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাঙ্কিং আফগানিস্তানের মত হবে, দেশেরও সার্বিক উন্নয়ন হবেনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>