—মননজয় মন্ডল—

প্রতিবছর ৮ মার্চ সমগ্র বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আর এ দিবসকে সামনে রেখে সরকারি বেসরকারিভাবে চলে বিভিন্ন লেখালেখি সংলাপ, আলোচনা ও নানা ধরনের নারী মুক্তি বিষয়ক প্রোগ্রাম আরে তা প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়াগুলোতে খুবই ফলাও ভাবে জন সম্মুখে উপস্থাপন করা হয়। আমরা যারা সাধারণ মানুষ এগুলো লুফে নেই সাময়ীকের জন্য। ৮মার্চ চলে যায়, ভুলতে থাকি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা। বছর ঘুরে মার্চের ৮ তারিখ তারিখে আবারও একইভাবে আড়ম্বরপুর্ণ পরিবেশে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতি বছরের ন্যায় এবছর ও সারা বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৬। এবছর বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে ‘অধিকার মর্যাদায় নারী পুরুষে সমানে সমান’। নারী পুরুষের সম অধিকার আজ সারা বিশ্বব্যাপী এক আলোচিত বিষয়। সেখানে বলা হচ্ছে পুরুষের মতই নারীকে সমান মর্যাদা, সমমজুরী, সমান সুযোগ-সুবিধা তথা সম অধিকার দিতে হবে, তবে আমরা একটি সমৃদ্ধশালী দেশ পাব। পুরুষ শাষিত সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মীয় গোড়ামী, নিপীড়ন, সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্যের বেড়াজালে নারীকে আবদ্ধ করে রাখা হয়। একজন নারী খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে রাত্রে বিছানায় ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তার দুই হাত অবিরাম কাজ করে। নারীরা সকাল থেকে রাত্র পর্যন্ত যে সাংসারিক কাজগুলো করে তার আর্থিক মূল্য বিবেচিত হয় না বলেই তার কাজগুলোকে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। একজন চাকরীজীবি পুরুষ সকাল ৯টার সময় ঘুম থেকে উঠে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত অফিস করে বাড়ি ফিরলেই তার দায়িত্ব বা দিনের কাজ শেষ। তুলনামুলক ভাবে একজন চাকরীজীবি নারী সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত অফিস ডিউটি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে সাংসারিক আরো শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব বা কাজ সম্পন্ন করে। একজন নারী ঘুম থেকে উঠে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে সাংসারিক শতাধিক কাজ সম্পন্ন করলেও তার সে সকল কাজের অর্থনৈতিক কোন মূল্যায়ন না থাকায় তার দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো আমরা মূল্যায়ন করি না। আমাদের তথাকথিত সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষেরা স্বাধীনভাবে ঘুরবে, কাজ করবে, গান শুনবে, খাবে, ঘুমাবে, খেলা করবে ইত্যাদি কাজগুলো স্বাভাবিক। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এগুলো একাবারেই বেমানান বা অস্বাভাবিক। একজন স্বামী সন্তান জন্ম দান করে পিতা হলেই যেন তার দায়িত্ব শেষ আর বাকী সব দায়িত্ব যেন মায়ের। সন্তান লানন পালনের হাজারো দায় দায়িত্ব সব ধরনের কষ্ট, ত্যাগ তিতীক্ষা মাকে অর্থাৎ নারীকে করতে হয়, আর এটাই যেন পুরুষ শাশিত সমাজ ব্যবস্থায় স্বাভাবিক এক প্রক্রিয়া। আমাদের দেশে যারা মহাজন ও মালিক শ্রেণি তারা এখনও পর্যন্ত নারী পুরুষের শ্রমের মূল্য বিভাজন তৈরি করে রেখেছেন। একই সময়ের একই কাজের জন্য নারী ও পুরুষ শ্রমিক এক সাথে সমপরিমান কাজ করলেও নারীর চেয়ে পুরুষ শ্রমিককে বেশি পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। গ্রামীণ পরিবেশের নারী শ্রমিককে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় বলে সমমজুরী নিয়ে কোন কথা বলার সাহস ও শক্তি একেবারে পায় না। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দুর করনের লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোদ সনদ সিডো গৃহিত হয়। আন্তর্জাতিক ভাবে প্রায় সকল ফোরামে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ তথা গুরুত্বপুর্ণ ও আন্তর্জাতিক সনদ ও দলিল সমুহে স্বাক্ষরের মাধ্যমে নারী উন্নয়নের বিশ্ব ভাবধারায় সম্পৃক্ত হয়েছে। গুরুত্বপুর্ণ এই সনদে স্বাক্ষরকারী গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮ (২) নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে “রাষ্ট ও গনজীবনের সর্বস্তরে নারী ও পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন”। স্কুল, কলেজ, অফিস আদালত, কর্মক্ষেত্র তথা সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে নারীরা অবহেলিত ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। হচ্ছে সামাজিক ব্যাধি ইভটিজিংয়ের শিকার। আমাদের ব্যক্তি কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে নারীকে মর্যাদার চোখে না দেখলে ইভটিজিং আইন করে বন্ধ করা কতখানী সম্ভব ? আমরা বর্হিবিশ্বে দেখতে পাই আমেরিকা, জাপান, জার্মানী, কানাডা, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশে নারীরা সকল ক্ষেত্রে পারদর্শি। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের নারীরা সঠিক ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সুউচ্চ দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজের সকল ক্ষেত্রে পারদর্শিতা প্রদান করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মানকে সমুজ্জল করতে পারবে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা বা নারী মুক্তি হঠাৎ কোন দৈববানীর মাধ্যমে আমাদের সমাজ থেকে উধাও হয়ে যাবে না। নিজের সাহস যোগ্যতা, আত্মনির্ভরশীলতা ও সুশিক্ষার মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদের নারী সমাজের উন্নয়ন হলে মানব প্রকৃতি বিকাশ সাধন তরান্বিত হবে। একজন নারীর আত্মবিশ্বাস জেগে উঠে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের মূল ¯্রােতধারায় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে। নারীকে পুরুষের মত সম সুযোগ প্রদানে ও নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দুর করতে সর্বাগে প্রয়োজন আমাদের ব্যক্তি কেন্দ্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আর এজন্য সরকারি বেসরকারি ও স্থানীয় জন উদ্যোগের মাধ্যমে বাড়াতে হবে জনসচেতনতা। আমাদের দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সকল ক্ষেত্রে পুরুষের মত নারীর গুরুত্ব কোন অংশে কম নয় এজন্য দায়িত্ববান ও সমাজ সচেতন সকলকে নারীকে সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, স্নেহ ও বন্ধুত্ব সুলভ আচরণে আবদ্ধ করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>