—গোলাম মোর্তোজা—

একটি অপহরণ, সাতটি লাশ, কিছু প্রশ্ন।
আপনি ভালো মানুষ, কোনো অপরাধ বা জটিলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। কিন্তু আপনি কি নিরাপদ? আপনার বাবা-সন্তান-আত্মীয় পরিজন- কতটা নিরাপদ?
অপরাধ যদি না করেন, তবে ‘নিরাপদ’ কিনা- এই প্রশ্ন আসবে কেন?
আইনজীবী চন্দন সরকার নিরপরাধ-নির্বিবাদী একজন মানুষ। কেউ বলবেন না যে তিনি কোনো অন্যায় করেছেন, কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন। এই মানুষটিকেও গুম এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো কেন?
প্রশ্নটা এখানেই।
আমি আপনি কেউ নিরাপদ নই। সে আপনি যতই ভালো মানুষ হয়ে থাকেন না কেন।
আপনি যখন বিপদে পড়বেন, আপনার স্ত্রী-স্বামী-সন্তান-বাবা-আত্মীয়-পরিজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যাবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনা শুনবেন, জানবেন, অভিযোগের গুরুত্বের ভিত্তিতে ত্বরিত ব্যবস্থা নেবেন। সব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সফল না-ও হতে পারেন। কিন্তু দৃশ্যমান তৎপরতায়, অভিযোগকারী অনুধাবন করতে পারবেন যে, তারা চেষ্টা করছেন।
এই আশায় প্যানেল মেয়র নজরুলের স্ত্রী সেলিনা হোসেন ছুটে গিয়েছিলেন পুলিশের কাছে। বলেছিলেন, তার স্বামীকে অপহরণ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট করে বলেছিলেন, ‘সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি নূর হোসেন এই অপহরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নূর হোসেনকে ধরলেই তার স্বামীর সন্ধান পাওয়া যাবে।’
সেলিনা হোসেন সাপ্তাহিক-এর সঙ্গে টেলিফোনে বলেন, ‘আমরা তো জানতাম আমার স্বামীকে কে হত্যা করতে পারে। অপহরণের সঙ্গে সঙ্গেই তো বুঝতে পারি, জানতে পারি নূর হোসেন এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। পুলিশের কাছে সবই বলেছি। অপহরণের পরদিন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে গিয়েছি। আকুতি জানিয়ে বলেছি, আমার স্বামীকে জীবিত উদ্ধার করে দেন। কে শোনে কার কথা। শুধু আশ্বাস দিয়েছেন, কোনো কাজ করেননি। পুলিশ চাইলেই আমার স্বামীকে বাঁচাতে পারত। এভাবে আমার স্বামীকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হতো না।’
পুলিশ তো বলছে নূর হোসেনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। রক্তমাখা মাইক্রোবাস…
‘আরে ভাই আমি রক্তমাখা মাইক্রোবাস, শার্ট দিয়ে কী করব? আমি আমার স্বামীকে চাই। পুলিশ খুঁজে পায় না? আমরা যখন অভিযোগ করেছি, তখন তো নূর হোসেনরা প্রকাশ্যেই ছিল। পুলিশ তাকে ধরার চেষ্টা করে নাই। শামীম ওসমান বলে, নূর হোসেন অপহরণ করে নাই। পুলিশ আমার কথা শোনে নাই। শুনেছে শামীম ওসমানের কথা। নূর হোসেন কোনো কাজ করে না শামীম ওসমানের কথা ছাড়া। শামীম ওসমান আমার স্বামীকে হত্যা করিয়েছে নূর হোসেনকে দিয়ে। আমার অভিযোগের সঙ্গে সঙ্গেই যদি পুলিশ নূর হোসেনকে ধরত, তবে আমার স্বামীকে ফিরে পেতাম। কেন পুলিশ নূর হোসেনকে ধরল না? কেন পুলিশ ঘটনার সাতদিন পর নূর হোসেনের বাড়িতে গেল।’
স্বামী হারানো সেলিনা হোসেনের আহাজারি ধারন করা যায় না। টেলিফোনের ও প্রান্তের বেদনা এ প্রান্তকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। প্রশ্ন করা যায় না, প্রশ্নের উত্তরও দেয়া যায় না? ‘কেন ধরল না?’ ‘কেন সাতদিন পর’?
প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না, প্রশ্ন করতেও পারি না। ফোন রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকি। লিখতে হবে, কলম চলে না।
কী লিখব, কেন লিখব?
যা লিখতে চাই, যে তথ্য জানি অতি ভয়ঙ্কর সেসব তথ্যের যথেষ্ট প্রমাণ আমার কাছে নেই। এসব তথ্য জানা যায়, কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণ থাকেও না।
এখন যদি কিছু লিখতে না হতো, অথবা যা জানি তা যদি লিখতে পারতাম, তবে শান্তি পেতাম। তা পারছি না। লিখতে হচ্ছে। তাই ভাসা ভাসা কিছু প্রসঙ্গে অবতারণা করছি শুধু।

১. নারায়ণগঞ্জ থেকে লিংক রোড দিয়ে ঢাকায় আসার পথে প্যানেল মেয়র নজরুল তার চার সহযোগীসহ অপহৃত হন। অপহরণের স্থানে দুটি মাইক্রোবাস এবং একটি জিপ দাঁড়ানো ছিল। অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে দেখলেন তাদের দুটি মাক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু একজন মানুষও বললেন না যে তিনি এই দৃশ্য দেখেছেন। যারা অপহরণ করেছেন, তারা তো আইনের ঊর্ধ্বে, অসীম ক্ষমতাবান। যে কাউকে যেকোনো সময় ধরতে পারেন, মারতে পারেন। তাদের কাছে জবাব চাওয়ার কেউ নেই। তারা যা করবেন সেটাই আইন।
২. নিহত নজরুল কখনো সহযোগী ছাড়া চলতেন না। একাধিক অস্ত্র থাকত তার নিজের কাছে, তার সহযোগীদের কাছে। অপহরণকারীরা বিনা প্রতিরোধে তাদের তুলে নিয়ে গেল? নজরুল তো জানত যে তাকে হত্যা করা হবে। তুলে নিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করা হবে, একথা নজরুলের না জানার কথা নয়। কোনো প্রতিরোধ বা গোলাগুলি হলো না কেন?
৩. যারা গাড়ি আটকে ছিলেন, নজরুল তাদের চিনেছিলেন। তারা অপহরণকারী হলে প্রতিরোধ হতো, গুলিবিনিময় হতো উভয় পক্ষের মধ্যে। কিন্তু যারা তাদের তুলে নিয়ে গেল তাদের তো আর গুলি করা যায় না। তারা নিজের গাড়ি থেকে নেমে অসহায়ের মতো মাইক্রোবাসে গিয়ে উঠতে বাধ্য হয়েছেন।
৪. কারা তুলে নিয়ে গেল? আইনজীবী চন্দন সরকার কেন ড্রাইভারসহ অপহৃত হলেন?
প্রশ্নের প্রথম অংশ শুধু প্রশ্নই থাক! দ্বিতীয় অংশ নিয়ে বলি। নজরুলের গাড়ির পেছন পেছন আসছিল চন্দন সরকারের গাড়ি। নজরুলের গাড়ির পেছনে এসে দাঁড়িয়ে যায় চন্দন সরকারের গাড়ি। কারা নজরুলদের তুলে নিচ্ছে, এটা দেখে ফেলেন, চিনে ফেলেন চন্দন সরকার। বলে দিতে পারেন, এই আশঙ্কায় তুলে নেয়া হয় চন্দন সরকার ও তার ড্রাইভারকে। কোনো প্রমাণ না রাখার জন্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন এই দুজনও।
৫. শামীম ওসমান বলছেন, সর্ষের মধ্যে ভূত। ভূত হয়ত তিনি নিজেও। তিনি প্রায় সরাসরি দায়ী করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে। তিনি নিজে বড়ভাবে অভিযুক্ত। এখন শামীম ওসমান বলছেন, অপহরণের ১০ মিনিটের মধ্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিষয়টি জানিয়েছেন।
১০ মিনিটের মধ্যে জেনে ঘটনার দুইদিন পর প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে ডেকে বললেন, যেকোনো মূল্যে অপহরণের ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে। তিন দিন পর অপহৃতদের লাশ পাওয়া গেল। তারও চারদিন পর প্রধান অভিযুক্ত নূর হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালালো পুলিশ।
৬. সাত দিন পরেও নূর হোসেনের বাড়িতে রক্তমাখা মাইক্রোবাস পাওয়া গেল। পাওয়া গেল চন্দন সরকারের ব্যবহৃত মোবাইল। তাহলে কি সঙ্গে সঙ্গে অপারেশন চালালে, নূর হোসেনকে গ্রেপ্তার করলে কি অপহৃতদের জীবিত পাওয়া যেত না?
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে, কারা তাকে হত্যা করতে পারে সেইসব নামও বলে এসেছিলেন নজরুল। এখন লাশ পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ‘মুখ দেখাবেন’ কেমন করেÑ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। অথচ অপহরণের পর তার কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।
৭. কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য ফোন করলাম পুলিশের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে। পরিচিত এই কর্মকর্তা এখন এ বিষয়ে কিছু বলতে চান না। আগে যা বলেছেন, সেই কথাটিই আবার বললেন, ‘পুলিশের কাছে সংবাদ ছিল, নূর হোসেনের বাড়িতে কিছু লোক মিটিং করছে। এই সংবাদের ভিত্তিতেই আমরা অপারেশন চালিয়েছি। মাক্রোবাসসহ কিছু আলামত উদ্ধার করেছি। নূর হোসেনের কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছি।’
এই অপারেশন সাত দিন আগে চালানো হলো না কেন?
‘তখন আমাদের কাছে কোনো সংবাদ ছিল না।’
অপহৃত নজরুলের স্ত্রীর অভিযোগ, তার দেয়া তথ্য কি কোনো সংবাদ নয়? এর ওপর ভিত্তি করে কি পুলিশ নূর হোসেনের বাড়িতে যেতে পারত না? নূর হোসেন তখন তো প্রকাশ্যেই ছিল। তাকে গ্রেপ্তার করা যেত না?
‘অপারেশনের কিছু প্রক্রিয়া আছে। যখনই আমরা সংবাদ পেয়েছি, তখনই অপারেশনে গিয়েছি। তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে আমার নাম উল্লেখ করে কিছু লিখবেন না। তদন্তের পর আমি আপনার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলব।’
৮. মানুষের জীবন নিয়ে কতটা দুর্বল যুক্তি দিয়ে অভিযুক্তকে ধরা থেকে বিরত থাকতে পারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী! কোনো একটি ঘটনার তথ্য পুলিশ আগে থেকে জানতে পারে না। আক্রান্ত ব্যক্তির আত্মীয় পরিজন সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে, সেটাও তাদের কাছে ‘অভিযান চালানোর মতো’ সংবাদ নয়!

প্যানেল মেয়র নজরুল, নূর হোসেনসহ সিদ্ধিরগঞ্জের রাজনীতিক-ক্যাডারদের বিষয়ে জানতাম অনেক আগে থেকেই। ‘হাসিনার ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ নামে অনেক আগে একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টও করেছিলাম। বেশকিছু বছর পর আবার সিদ্ধিরগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখলাম, অনেক কিছু বদলে গেছে। আগেও প্রশাসনের সহায়তা ক্যাডার-মাস্তান-হত্যাকারী-রাজনীতিবিদরা পেত। তবে এখনকার মতো নয়। এখন প্রত্যক্ষদর্শীর চোখ দিয়ে দেখলাম ক্যাডার-মাস্তান-চিহ্নিত চাঁদাবাজ-হত্যাকারী-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী একাকার হয়ে গেছে। তাদের কর্মকাণ্ড আলাদা করা যায় না। সিদ্ধিরগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের প্রায় সব মানুষ জানেন আসল ঘটনা। কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে রাজি নন। এই অঞ্চলের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হলো। জানার, বোঝার চেষ্টা করলাম আসলে কী ঘটছে নারায়ণগঞ্জে। তার ওপর ভিত্তি করেই এই লেখা।
৯. অপহরণ যারা করেছিল তারা সাধারণ অপহরণকারী নয়, বিশেষ প্রশিক্ষিত বাহিনী। তারা অপহরণ করে নূর হোসেন বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছে। আমাদের অনুসন্ধানে জেনেছিলাম, অপহরণ হত্যার বিনিময়ে টাকার পরিমান ছিল এক কোটি। পরবর্তীতে নিহত নজরুলের শ্বশুর সুনির্দিষ্ট করে বলেছেন ৬ কোটির কথা। নূর হোসেনের চাঁদাবাজি, বালুমহল, আটকে রেখে চাঁদা নেয়ার যে পরিমাণ, সেখানে ছয় কোটি মোটেই বেশি টাকা নয়।
১০. নূর হোসেন বাহিনী অপহৃতদের নিয়ে দূরে কোথাও বা এলাকার বাইরে চলে যায়নি। নারায়ণগঞ্জের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। অদৃশ্য তৎপরতাও পরিলক্ষিত হয়নি। অপহরণকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমঝোতা ছিলÑ এমন অনেক গল্প ছড়িয়ে আছে সিদ্ধিরগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জে।
১১. যেখান থেকে অপহৃত হয়েছে এবং যেখান থেকে লাশ পাওয়া গেছেÑ এই কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে পুলিশ-র‌্যাবের অভিযান দৃশ্যমান থাকলে, হয়ত অপহৃতদের জীবিত উদ্ধার করা যেত। সিদ্ধিরগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জের প্রায় সব মানুষ এ কথা বিশ্বাস করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকে বিশ্বাস করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশকে মনে হচ্ছে অসহায়। তারা সবই জানেন কিন্তু করতে পারছেন সামান্যই।
১২. প্রধানমন্ত্রীর ‘যেকোনো মূল্যে রহস্য উদ্ঘাটন’ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ‘বড় কিছু’… নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে হাসাহাসি এবং ক্ষোভের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
১৩. নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে যত অপকর্ম ঘটেছে তার সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওসমান পরিবারের নাম। প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদের কারণেই ওসমান পরিবার, শামীম ওসমান এতটা বেপরোয়াÑ এ নিয়ে নারায়ণগঞ্জের মানুষের রয়েছে তীব্র ক্ষোভ।
১৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে কেন ভালো কাজ করাতে পারছেন না প্রধানমন্ত্রী, সেটা নিয়ে অনেক প্রশ্ন নারায়ণগঞ্জবাসীর মনে। প্রধানমন্ত্রী কি পারছেন না, নাকি চাইছেন না?
শামীম ওসমানের তো জনসমর্থন নেই। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মীও তাকে অপছন্দ করেন। তার মতো একজন অতি ক্ষতিকর মানুষের পেছনে কেন প্রধানমন্ত্রীর এই সমর্থনÑ নারায়ণগঞ্জের মানুষ হিসাব মেলাতে পারেন না।
১৫. ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর মতো এত গ্রহণযোগ্য, ক্লিন ইমেজের নেতা থাকার পরও কেন সন্ত্রাসী-গডফাদারদের সমর্থন দিচ্ছে আওয়ামী লীগ? কিছু তো অর্জন হচ্ছে না, শুধুই ইমেজে ধস নামছে। তারপরও কেন গডফাদারের পেছনে দাঁড়াচ্ছে দলীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্ব?
ওসমান পরিবারের টর্চার সেল, নূর হোসেনের গাড়ি শামীম ওসমানের আত্মীয়ের ফ্যাক্টরিতেÑ এসব কিছুকেই তিনি ম্যানেজ করে ফেলতে পেরেছেন, পারছেন।
১৬. নজরুল এবং নূর হোসেন দুইজনই শামীম ওসমানের ক্যাডার। গত মেয়র নির্বাচনে শামীম ওসমান পরাজিত হয় ডা. আইভীর কাছে। শামীম ওসমান মনে করেন সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় যে সে কম ভোট পেয়েছিল তার কারণ নজরুল। নজরুল তার পক্ষে নয়, কাজ করেছে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে। এ কথা শামীম ওসমান নির্বাচনের পর অনেককে বলেছেও। মূলত মেয়র নির্বাচনে শামীম ওসমানের ভরাডুবি নজরুলের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৭. হত্যা-গুম-আতঙ্কের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজ প্রতিবাদ জানাতে চাইছে। সরকার তা-ও করতে দিতে রাজি নয়। পুলিশ গুম ঠেকাতে না পারলেও নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ ছত্রভঙ্গ করে দিতে পারদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছে। এখান থেকেও কিছু অভিজ্ঞতা নেয়ার আছে। চৌধুরী আলম, ইলিয়াস আলী গুমের সময় নাগরিক সমাজকে এতটা তৎপর হতে দেখা যায়নি। ফলে যারা অপহরণ করেছে তাদের সাহস শুধু বেড়েছে। আজ যখন প্রতিবাদ করতে চাইছে নাগরিক সমাজ, তখন সরকার প্রতিবাদ করতে দিতে রাজি নয।
বিরোধী দলের সঙ্গে যখন এমন আচরণ করেছে, তখনও অনেকেই কথা বলেননি, যদিও তাদের কথা বলা দরকার ছিল। সরকার এখন একক দানব হয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে দেশ চালাতে চাইছে। সারা দেশই এখন নারায়ণগঞ্জ হয়ে উঠেছে।

নারায়ণগঞ্জবাসী জানেন না, এর শেষ কোথায়? তারা জানেন নারায়ণগঞ্জে থাকা যাবে না, ব্যবসা করা যাবে না। চলে যেতে হবে ঢাকায়। যাদের সামর্থ্য আছে তারা তাই করছেন। তারপরও তারা কিছু বিষয় জানতে চাইছেনÑ
ক. এই সাত অপহরণ হত্যা-রহস্য কি উন্মোচন হবে?
খ. দু’টি মাইক্রোবাস এবং জিপ নিয়ে কারা তুলে নিল নজরুলদেরÑ জানা যাবে সেই তথ্য?
গ. নূর হোসেন ও তার সহযোগীরা কি গ্রেপ্তার হবে?
এই প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর যাদের দেয়ার কথা, তারা দেবেন না। তারা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এমন সব কথা বলবেন তার থেকে উত্তর খুঁজে পাবেন না নারায়ণগঞ্জবাসী, দেশবাসী।
‘অপহরণ-হত্যা বিএনপি করছে’- প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কিংকর্তব্যবিমূঢ় নারায়ণগঞ্জের মানুষ। এই কথার মধ্য দিয়ে মানুষ উত্তর খুঁজে নিয়েছে ‘প্রকৃত রহস্য’ উন্মোচন হবে না। উন্মোচন করা হবে না।
দু’টি মাইক্রোবাস এবং জিপে কারা কারা সাতজনকে নিয়ে গেলÑ এই তথ্য কোনোদিন জানা যাবে না। যেমন জানা যায়নি চৌধুরী আলম বা ইলিয়াস আলীকে কারা নিয়ে গেল। তদন্ত সেদিকে যাবেই না।
নূর হোসেন ও তার সহযোগীরা ধরা পড়বে কিনা, নিশ্চিত না। তাদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে বলে পুলিশ অপারেশনে গেছে সাতদিন পরে। তবে সবাই না হলেও কয়েকজনের আটক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আটক হওয়ার সম্ভাবনা আছে নূর হোসেনেরও। তবে তা তদন্ত বা প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের জন্যে নয়। প্রকৃত ঘটনা যাতে কোনো দিন উন্মোচন না হয়, সেই কারণে। এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে যারা ধরা পড়বে বা ধরা হবে, নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের জীবনের সমাপ্তি ঘটবে ক্রসফায়ারে।
ত্বকীসহ আরও অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের মতো অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে ভিন্নখাতে নিয়ে যাওয়া হবে এই সাত অপহরণ-হত্যাকাণ্ড। হত্যাকারীরা আবার নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগুবে। গডফাদারের সাম্রাজ্য অক্ষত থাকবে। বাড়বে নারায়ণগঞ্জবাসীর মনের চাপা ক্ষোভ। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্নতা বাড়বে দেশের মানুষের। তাতে কি? নিজেরা নিরাপদ থাকলেই হলো। জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে এত ভাবার কী আছে। ভোটের জন্যে তো আর জনগণের কাছে যেতে হবে না, বর্তমান পদ্ধতিতে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>