প্রবাসে আমার প্রধান এবং একমাত্র কাজ হচ্ছে সারাদিন ফেসবুকে বসে থাকা। বুধবার হোম পেইজে দেখি সাভার নিয়ে রাজ্যের মানুষের স্ট্যাটাস! ব্যাপার কী!! যত পড়ি আঁতকে উঠি। শেষে না পেরে মা-কে ফোন দিলাম। অপর প্রান্ত থেকে যা শুনলাম তাতে শিউরে উঠলাম! যত নিউজ আসছে, যত খবর পড়ছি কষ্টে বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছে। ভিতর কুঁচকে কান্না আসে। যখন ঘটনার ৪৮ঘন্টা পরও মানুষকে জীবিত পাওয়ার নিউজ দেখি তৎক্ষণাৎ শেয়ার দেই। এটা যেন আনন্দ ভাগাভাগি করা। কেউ কোন কিছু লাগবে বলে স্ট্যাটাস দিলে তাড়াতাড়ি শেয়ার দেই, মনে হয় আমার এই শেয়ারেই হয়ত সেই জিনিসটা পাওয়া যাবে। আমার এক আমেরিকান বন্ধু ভাবল আমাদের দেশে ভূমিকম্প হয়েছে। এমনি এমনি যে নয়তলা ভবন ধসে পড়তে পারে তা তারা ভাবে নি! জানি সামনের মঙ্গলবার যখন দেখা হবে অনেক প্রশ্ন করবে মনে মনে একটা উত্তর গুছিয়ে রেখেছি। উত্তরটা এমন হবে যাতে দেশের অবস্থাও বুঝা যায় আবার সাধারন মানুষের অবদান এর কথার প্রকাশ পায়। আসলেই কী কষ্টটা করছে সাধারন মানুষ!কিছু কিছু মানুষকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করলাম। এক ইরেশ জাকের। উনি আমার কখনই প্রিয় অভিনেতা ছিলেন না, শুধু ভাল লাগত। এই মানুষটা আমার এত প্রিয় হয়ে গেল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম রাত তিনটার সময় উনি সাভারের আপডেট দেন! আমি রাত চারটাও ফেসবুকে ঢুকেছি শুধু ওনার থেকে সাভারে আপডেট পাওয়ার জন্য। যখন দেখি অনিক ভাই স্ট্যাটাসে জানায়ে তাদের সাথে মেহেদি ভাইও উদ্ধারের সাথে আছেন মনটা ভরে যায়! কানাডা থেকে যারা সাহায্য করতে চায় তাদের যোগাযোগের ফোন নাম্বারের মাঝে যখন পরিচিত তিমুর ভাইয়ের নাম দেখি গর্বই লাগে। মিতুর আঁকা একটি ছবি জানি সবাইকে নতুন করে ভাবিয়ে দেয়।

এদিকে সমিক সাভারে টাকা পাঠাচ্ছে। দেশে আমার নিজের টাকা যা ছিল আসার আগে খরচ করে এসেছি কাজেই আমার হাতে কোন টাকা নেই। শেষে লজ্জার মাথা খেয়ে বইমেলার এত পরে প্রকাশক রনিভাইকে একটা ম্যাসেজ দিলাম। উনি তৎক্ষণাৎ রিপ্লাই দিলেন! যেই রনি ভাইকে মেইল দিলে উত্তর পাই তিনদিন পরে। মাঝে মাঝে এমন হয় যে উত্তরও পাই না তখন ভাবিকে ধরে বলি ওনাকে মেইল চেক করতে বলেন। সেই রনিভাই রিপ্লাই তো দিলেনই এবং জানালেন আমার টাকা ব্যাংক খুলতেই মা-র কাছে দিয়ে আসবেন। আমি অনেক ম্যাসেজ ছলছল চোখে পড়েছি সেদিন আবার পরলাম। আজ মা জানাল নীষা ও তার বন্ধুরা মিলে আমার টাকাসহ বাসার সবার টাকা জমা দিয়েছে।

গতকাল বৃষ্টি পরল। বৃষ্টি আমার খুব প্রিয়। দেশে থাকতে সময় অসময়ে বহু ভিজেছি। কিন্তু গতকাল বৃষ্টির কথা শুনে ভয়ে আঁতকে উঠলাম! মনে হল ছোট ছোট উদ্ধারের গর্তের মাঝে না জানি কত পানি ঢুকে যাচ্ছে! কয়েকজনের সাথে কথা বলে যেন পরিস্থিতিটা বুঝলাম। আমি খুব নামাজি না। ফাঁকিবাজি নামাজি ধরনের। সেদিন জুম্মা পড়তে মসজিদে গেলাম। দোয়ার সময় যে আমার কী হল আমি আকুল হয়ে কাঁদতে থাকলাম। আমার পাশে বসা মহিলা জিজ্ঞাসাই করে ফেলল কী হয়েছে। একতো সবার সামনে কাঁদছি এই লজ্জায়ে বাঁচি না তার উপর প্রশ্নের উত্তর। উনি বলল, তোমার কোন আত্মীয় ছিল ওখানে? আমি বহু কষ্টে বললাম, নাহ, তবে আমার দেশের মানুষ ছিল। আসলেইতো দেশের মানুষ!! পেপার পড়ে, টিভি দেখে সবাই যেন কেঁদে বুক ভাসিয়ে, কাঁধে কাধ মিলিয়ে এক হয়ে গিয়েছে। যখন রক্ত লাগবে বলছে মানুষ এত এসেছে যে পরে বলা হল আর লাগবে না, যখন অক্সিজেন লাগবে বলল হাজার হাজার এসে গেল!! এই হচ্ছে আমার দেশের মানুষ। এই ভাঙ্গা ভবন থেকে আড়াই হাজারের বেশি জীবিত মানুষ বের করে এনেছে! মৃত্যু সংখ্যার থেকে উদ্ধার সংখ্যা বেশি!

আমি দিব্যি খাচ্ছি, রাঁধছি কিন্তু ওখানের কী অবস্থা। মাঝে মাঝে নিজেকে খুব স্বার্থপর লাগে! আমার ঘুমের কোন সমস্যা কোন কালেই ছিল না। প্রচণ্ড মানসিক কষ্টেও আমি ঘুমাতে পারি। এই ঘটনার পর ঘুম আসে না, গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়, কেমন জানি অস্থির লাগে। আচ্ছা দুইজন মায়ের না ওখানে বাচ্চা হয়ে গিয়েছে, তারা কী বেঁচে আছে? কয়েকটা ছবি আমি ভুলতে পারছি না! কাজ করতে করতে মনে পরে যাচ্ছে। একটা লোক উল্টো হয়ে ঝুলে আছে! পা উপরে মাথা নিচে। দুইদিক থেকে দেয়াল চেপে আছে। বয়স ৩০ কম হবে। আরেকটি ছবি একটা ফর্সা পায়ে নূপুর পরা! চারটা আঙ্গুলের রক্ত লেগে আছে। শুধু পায়ের পাতা বেড়িয়ে আছে ভাঙ্গা ভবনের ভিতর থেকে। আরেকটি ছবি দুপুরের খাবারের বক্সটা খোলা ভিতরে সবজি মাখান ভাত আর অল্প একটু আমিষ পাশে ইটের টুকরো পরে আছে। আরেকটি ছবি লোকটি মহিলাকে জড়িয়ে আছে। লোকটির নিটল মুখ, মাথা ভর্তি চুল, নাক দিয়ে রক্ত পরে জমে আছে মহিলাটিকে শক্ত করে ধরে থাকা সত্ত্বেও তিনি এলিয়ে পরে আছে তার হাতে একটা চুড়ি!! উফ কী কষ্ট! কী কষ্ট!আমি ছবিগুলো ভুলতে পারছি না। কোন পাপ তারা করে নি এত কষ্টের মৃত্যু তাদের কেন ঈশ্বর দিল!? সুমনের সেই লাইনটা মনে পরে, ‘প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা’

যখন কোন পরিচিত বা বন্ধু বলে তোমরাই ভাল আছ বিদেশে। গাঁয়ে কাঁটার মত লাগে কথাটা শুনতে আমার। আমরা যারা কর্মসূত্রে, পড়াশুনা সূত্রে অথবা বিদেশে খুঁটি গড়ার সূত্রে বিদেশ পরে আছি তারা জানি হাজার হাজার মাইল দূরের ছোট্ট দেশটি কী!! দেশে সবাই মারা যাবে আমি দিব্যি খেয়ে বেঁচে থাকব এর চেয়ে বড় অভিশাপ বোধহয় আর নেই।

অপলা হায়দার

২৭।৪।১৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>